পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে তিন কমিটি বাতিলসহ চার দফা দাবিতে রাঙামাটিতে মানববন্ধন

আইপিনিউজ বিডি, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাঙ্গামাটিঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন, সরকারের গঠিত তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির কার্যক্রম বাতিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ চার দফা দাবিতে রাঙামাটিতে সমাবেশ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজের ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া লিখিত স্মারকলিপি রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি ও সাবেক উপসচিব প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশ সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইন্টুমনি তালুকদার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সাহিত্যিক শিশির চাকমা।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার সহ-সভাপতি স্বপন কুমার মল্লিক, বাংলাদেশ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার সহ-সভাপতি লোমা লুসাই, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ইন্দুলাল চাকমা এবং বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শ্যামা চাকমা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিশির চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট নিরসনে অতীতে বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং স্থায়ী অধিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করা।
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট আরও জটিল হয়েছে। বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবর্তে একের পর এক এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা পাহাড়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি প্রসঙ্গে শিশির চাকমা বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে একতরফাভাবে এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, কমিটিগুলোতে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকায়নের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, “পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ কর্তৃত্ববাদ ও সামরিকায়ন মেনে নেবে না। যাদের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে একতরফাভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে পাহাড়ের জনগণ তা মেনে নেবে না।”
সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ শান্তি ও চুক্তি বাস্তবায়নের প্রত্যাশায় সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবর্তে চুক্তিবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, “আমরা সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের জনবিরোধী কার্যক্রম প্রত্যাশা করি না। আমরা চাই, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুক।”

স্বপন কুমার মল্লিক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদভাবে বসবাস করতে চায়। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্যবাসীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার সহ-সভাপতি লোমা লুসাই বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার আহ্বান জানান।
সমাবেশ থেকে চারটি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে অন্যত্র পদায়ন এবং চুক্তি লঙ্ঘন না করে এ মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ না করা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব হেলাল উদ্দিনকে তিন পার্বত্য জেলার আইন-শৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছটা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনকল্যানমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারী কার্যাবলী তদারিক ও সমন্বয়ের দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদান করা।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের বৈধ ও উপযুক্ত প্রতিনিধির সাথে আলোচনা করে গঠিত তিনটি কমিটি: ১। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, ২। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি ও ৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি সমূহের কার্যক্রম বাতিলকরণসহ সরকারের উ”চ পর্যায়ের তিনটি কমিটি: ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি ২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি; ও ৩. ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স; পূনর্গঠন করা ।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সমাবেশ ও মানববন্ধন শেষে আয়োজকদের একটি প্রতিনিধি দল চার দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কাছে প্রদান করে। স্মারকলিপিতে সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ও সময়বদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।


