বিশেষ প্রতিবেদনমানবাধিকার

খাগড়াছড়ি-রাঙামাটির সাম্প্রদায়িক হামলার দুই বছর: তদন্ত প্রতিবেদন নেই, বিচারও অধরা

আইপিনিউজ বিডি, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদকঃ আজ খাগড়াছড়ির সদর ও দীঘিনালা এবং রাঙামাটি জেলা শহরে ২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর সংঘটিত সেটেলার বাঙ্গালী কর্তৃক সাম্প্রদায়িক হামলা, হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে দুই বছর পরও এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দীঘিনালা উপজেলা সদরের লারমা স্কয়ার এলাকায় পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অন্তত ৩০টি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। পরে বিভিন্ন স্থানীয় ও অধিকারভিত্তিক প্রতিবেদনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে দাবি করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সহিংসতায় দীঘিনালায় ধন রঞ্জন চাকমা নিহত হন এবং খাগড়াছড়ি সদরে সেনাবাহিনীর গুলিতে জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা নিহত হন। পরদিন ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি শহরে হামলার ঘটনায় অনিক চাকমা নিহত হন। একই প্রতিবেদনে কয়েকশ মানুষ আহত এবং বহু বাড়িঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ২০২৪ সালের ঘটনাকে ভিন্নভাবে বর্ণনা করে জানিয়েছিল, ১৯ সেপ্টেম্বর দীঘিনালায় সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। একই রাতে খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর এলাকায় সেনা টহল দলের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে এবং এতে তিনজন নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়।

তদন্ত কমিটি, কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশ্যে নেই

ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিবাদের মধ্যে ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে সহিংসতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

কমিটি ২৯ সেপ্টেম্বর দীঘিনালার লারমা স্কয়ারসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। তখন কমিটির প্রধান জানিয়েছিলেন, ভিডিও ফুটেজ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তবে দুই বছর পরও ওই তদন্ত প্রতিবেদনের প্রকাশ্য কোনো অনুলিপি বা সুস্পষ্ট অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অনিক চাকমা হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থা

২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি শহরে হামলার সময় কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী অনিক চাকমা নিহত হন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয় বলে জানা যায়।

অনিক চাকমা হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা আদর সেন চাকমা ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাঙামাটি কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশও একটি মামলা করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকেও মামলা করা হয়। স্থানীয় ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানা যায়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন– অনিক চাকমা হত্যা মামলার আসামী মোঃ রুবেল (২৩), মোঃ জালাল (২৭) ও আরবার (১৭) এবং অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের মামলার আসামী রাকিব (২৭) ও আরিফুল (১৭)। অনিক চাকমা হত্যা মামলার তিন আসামীর মধ্যে একজন মোঃ রুবেল ইতোমধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে হত্যা মামলার আসামী আবরার (১৭) এবং অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের মামলার আসামী রাকিব (১৭) দুইজনকে নাবালক হিসেবে অনেক আগে কারাগার থেকে স্থানান্তর করে জাতীয় কিশোর উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, অনিক চাকমা হত্যা মামলায় রুবেল, জালাল ও এক কিশোরসহ কয়েকজন এবং অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুরের মামলায় আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে আসামিরা পরবর্তী জামিন মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু মামলা কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফলে দুই বছর পরও অনিক চাকমা হত্যাকাণ্ডের বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিহতদের স্বজনেরা দুই বছরেও বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

বৃহত্তর হামলার বিচার নিয়েও প্রশ্ন

২০২৪ সালের ১৯–২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে একাধিক মামলা দায়ের হলেও হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে জড়িত সেটেলার বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, ফলে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পিসিজেএসএসের প্রতিবেদনে হামলার ঘটনায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল। সংগঠনটি হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছিল।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের সহিংসতার দুই বছরে মূল প্রশ্নগুলো হলো—তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কোথায়, হামলায় জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও শনাক্তকরণ কতদূর এগিয়েছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে কতগুলো মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কী ধরনের বিচার ও ক্ষতিপূরণ পেয়েছে।

স্থানীয় অধিকারকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, বিচারহীনতা অব্যাহত থাকলে পাহাড়ে সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ২০২৪ সালের ১৯–২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলোর একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ মোঃ মামুন (৪০) নামে এক সেটেলার বাঙালি খাগড়াছড়ি সদরের মধুপুর থেকে একটি মোটর বাইক চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতার ধাওয়া খেয়ে বাইক থেকে পড়ে গিয়ে, পরে জনতার পিটুনিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর মারা যায়। জানা গেছে, এই সময়ে ওই মামুনের বিরুদ্ধে চুরি ও মাদক সংক্রান্ত অন্তত ১৭টি মামলা চলমান ছিল। পরে ঐ দিনই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নেতৃত্বে সেটেলার বাঙালিদের একটি দল মধুপুর সহ খাগড়াছড়ি সদরের একাধিক এলাকায় জুম্মদের উপর হামলার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে জুম্মরা প্রতিরোধে এগিয়ে আসলে সেটেলাররা পিছু হটে। ফলে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা ও খাগড়াছড়ি সদরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক জুম্মদের উপর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাঙ্গামাটি জেলা সদরে আদিবাসী জুম্ম ছাত্র-যুবকরা একটি মিছিল বের করলে এক পর্যায়ে সেটেলার বাঙালিদের সাথে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এক পর্যায়ে সেটেলার বাঙালিরা বনরূপা এলাকা হতে হ্যাপি মোড়, দক্ষিণ কালিন্দীপুর, আঞ্চলিক পরিষদ ভবন ও বিশ্রামাগার, বিজন সরণী এলাকাব্যাপী জুম্মদের উপর, বসতিতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়।

Back to top button