পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন তিন কমিটিতে সামরিক-গোয়েন্দা প্রাধান্যে CHTC ও IWGIA-এর উদ্বেগ

আইপিনিউজ বিডি, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আন্তর্জাতিক সংবাদঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রাধান্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন (CHTC) ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (IWGIA)।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনটি প্রজ্ঞাপন জারি করার পর এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানায় সংগঠন দুটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন কমিটিগুলোর গঠন, দায়িত্ব ও কার্যপরিধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে নীতি প্রণয়ন, সমন্বয় ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।
CHTC ও IWGIA-এর মতে, এই কাঠামো ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক উদ্দেশ্যের বিপরীতমুখী। তাদের ভাষ্য, চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেসামরিক, গণতান্ত্রিক ও আঞ্চলিকভাবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া।
বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯ সদস্যের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হলেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাকে প্রধান সমন্বয়কারী এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালককে সদস্য-সচিব করা হয়েছে। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালককেও কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
এ কমিটিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়, নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কাজের পরিধি নির্ধারণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির সচিবালয়ের জন্য জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা দেওয়ার দায়িত্বও ডিজিএফআইকে দেওয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, নির্বাহী কমিটিতেও নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে বলে জানায় CHTC ও IWGIA। কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে স্বরাষ্ট্রসচিব থাকলেও ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক, বিজিবি ও আনসারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংগঠন দুটি বলছে, নির্বাহী কমিটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ মোকাবিলাকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য জাতীয় কৌশল প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত, সংশ্লিষ্ট বিধি ও আইন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার বা নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
CHTC ও IWGIA-এর মতে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা-প্রধান একটি কমিটির অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ‘পর্যালোচনা’র উদ্যোগ গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাদের বক্তব্য, চুক্তিটি বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি রাজনৈতিক চুক্তি। ফলে চুক্তির কোনো পরিবর্তন বা পর্যালোচনা হলে উভয় পক্ষের অংশগ্রহণে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে তা হওয়া উচিত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রজ্ঞাপনে ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত হয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি, মানবাধিকার নিয়ে কাজ এবং আদিবাসী পরিচয়ের বৈধ প্রকাশকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করে সংগঠন দুটি।
তৃতীয় কমিটি হিসেবে গঠিত উপদেষ্টা কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তা যথেষ্ট ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে না বলেও অভিযোগ করেছে CHTC ও IWGIA।
তাদের মতে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে যারা কমিটিতে রয়েছেন, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন; বরং বর্তমান সরকার তাদের নিয়োগ দিয়েছে। ফলে তাদের অংশগ্রহণকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যানের পরিবর্তে তার একজন মনোনীত প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। তিন সার্কেল চিফ, হেডম্যান ও কারবারিদের জন্যও কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, নতুন কমিটি গঠনের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠন দুটি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সা চিং প্রু জেরী জানিয়েছেন, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকি সাতটি বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা ও কার্যক্রম চলছে।
CHTC ও IWGIA আরও অভিযোগ করেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন আদিবাসী মন্ত্রীর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে মির মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা উল্লেখ করা হলেও, বিভিন্ন প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও কর্তৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কথাও উঠে এসেছে।
পরবর্তীতে সা চিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংগঠন দুটির দাবি, তিন পার্বত্য জেলা—রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এর তদারকির দায়িত্ব একজন অ-আদিবাসী প্রতিমন্ত্রীর হাতে দেওয়ায় আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকর কর্তৃত্বের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে CHTC ও IWGIA সরকারকে নতুন তিন কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা ও সাময়িক স্থগিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং আদিবাসী নারী ও যুব প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডিজিএফআই ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় ও সচিবালয়-সংক্রান্ত ভূমিকা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা-প্রধান কমিটির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত বাতিল এবং চুক্তি একতরফাভাবে সংশোধন বা পুনর্ব্যাখ্যা না করার বিষয়ে সরকারি নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
সংগঠন দুটি আরও দাবি করেছে, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন ও সক্রিয় করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করা এবং ১৯৯৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে হবে।
এ ছাড়া ‘অপারেশন উত্তরণ’ নামে পরিচিত নির্বাহী আদেশ প্রত্যাহার, পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত এবং অস্থায়ী সামরিক ও নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানিয়েছে CHTC ও IWGIA।
সবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিশেষ পদ্ধতির ম্যান্ডেটধারী ও মানবাধিকার চুক্তিভিত্তিক সংস্থাগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠন দুটি।


