পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা সৃষ্টি মৌলিক অধিকারের লংঘন: নাগরিক সমাজের গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন

আইপিনিউজ বিডি, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকাঃ সম্প্রতি পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন এবং রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদানে জামায়েত ইসলামীর বাধা প্রদানকে কেন্দ্র করে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঞ্চার করছে। এ ঘটনায গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে ২৮ জন নাগরিক নিম্নলিখিত বিবৃতি প্রদান করেছেন।
“গত ২৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর গার্ড অব অনার ও দাফনকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে সৃষ্ট পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যনুযায়ী, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা সেটি ভরাট করে দেন। পরবর্তীতে আনুমানিক রাত ২টার পর মানিক পশারীর মেয়ে ও দুই বোন গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মোবাইল ফোনের আলোয় আবার কবর খুঁড়ে মৃত্যুর প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে দাফন সম্পন্ন হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষবিদায়কে ঘিরে এমন পরিস্থিতি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দেয়।
পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই ২৪ অক্টোবর তিনি মারা যান। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে দাফন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু যারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল সেই জামায়তে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা সেই প্রশ্ন তুলে তাকে দাফন করতে বাধা প্রদান করা হয়। কোন ব্যাক্তির মৃত্যুর পর তার দাফনের অধিকার তার মৌলিক মানবাধিকার। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এমনকি রাষ্ট্রও এ অধিকার লংঘন করতে পারেনা। পরবর্তীতে পিরোজপুর পুলিশ লাইনে তার মৃত দেহ নিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তথ্যনুযায়ী, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে প্রায় ১৫ ঘণ্টা তাঁর দাফন আটকে থাকে। স্বভাবতই প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কোন ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কিনা তা নির্ধারণ করার একমাত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি কখনও প্রয়োজন মনে করে তবে সে তা যাচাই-বাছাই করতে পারে। স্বাধিনতার বিরোধীতা করা দল কোন পর্যায়ে ঠিক করে দিতে পারেনা কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে নন। যে দলটি ‘৭১ সালে শুধু স্বাধীনাত ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাই করেনি, যার নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবি হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ দালিলিকভাবে প্রমানিত। এবং তারা আজ পর্যন্ত সেই অপরাধের দায় স্বীকার বা মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতার জন্য নূন্যতম প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রর্থনা করেনি। এছাড়া মানিক পশারীর সাথে যে কর্মকান্ড সংঘঠিত হয়েছে তা ফৌজদারী অপরাধের সামিল। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীতের ভূমিকার কারণে তাঁর জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেখানে মৃত ব্যক্তির যথাযথ মর্যাদায় সৎকার করা ইসলাম ধর্মসহ সব ধর্মেরই অনুশাসন এবং অবশ্য পালনীয় শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত। সেই শিক্ষাকে অবজ্ঞা দেখিয়ে মানিক পশারীর প্রতি যে অসম্মান তারা দেখিয়েছে তাকে ধিক্কার জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই। যারা এ ধরণের ফৌজদারী অপরাধের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে উপযুক্ত কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।”
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন-
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন ২. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি ৩. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি ৪. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ৫. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ৬. রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ৭. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী ৮. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি ৯. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১১. ড. তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১২. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৩. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এবং পলিটিকাল সাইন্স ১৫. ড. নোভা আহমেদ, অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ১৬. রেহনুমা আহমেদ, লেখক ও গবেষক
১৭. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ১৮. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ১৯. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ ২০. মো: নুর খান, মানবাধিকারকর্মী ২১. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২২. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকার কর্মী ২৩. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ ২৪. এড. সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন ২৫. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী ২৬. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী ২৭. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকার কর্মী ২৮. মুক্তাশ্রী চাকমা, অধিকার কর্মী


