পিসিপি বান্দরবান জেলা শাখার ২২ তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ১৬ মে, বান্দরবান প্রতিনিধিঃ গতকাল ১৫ মে ২০২৬ (শুক্রবার) “চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী সকল প্রকার ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করুন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হউন” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বান্দরবান সাংস্কৃতিক ইনিস্টিউট অডিটোরিয়ামে পিসিপি বান্দরবান জেলা শাখার ২২ তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ- সাধারণ সম্পাদক উ উইন মং জলি। সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উশৈহ্লা মারমা। হিল উইমেন্স ফেডারেশন বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উলিসিং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বান্দরবান জেলার সহ-সভাপতি রেং এম ময় বম এবং আরো উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমা।
সম্মেলনের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এযাবৎকালে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পিসিপি’র বান্দরবান জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জামাধন তনচংগ্যার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রোংথোইন ম্রো।
প্রধান অতিথি উ উইন জলিমং বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন, নির্যাতনের যাঁতাকলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্ম হয়। জন্মলগ্ন থেকে আজও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ সংগ্রাম থেকে পিছপা হয়নি। তিনি জুম্মদের মরণফাঁদ কাপ্তাই বাঁধের কথা স্মরণ করে বলেন, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করার পূর্বে জুম্মদের বলা হয়েছিলো জমির বদলে জমি, বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা জুম্মরা ভোগ করতে পারবে এই আশ্বাস দেখিয়ে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধে বিরুদ্ধে এম এন লারমা ছাত্রবস্থায় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন। তিনি আরো বলেন গত ১৫ বছর বান্দরবানে জুম্মদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছিলো না। ফ্যাসিস্ট সরকার পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এবং জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মীদের মামলা হামলার মধ্যে দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও প্রগতিশীল ছাত্র ও তরুণ সমাজ আবারো অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সোচ্চার হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ছাত্র সমাজের গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে। ছাত্র সমাজই পারবে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করতে। তাই তিনি ছাত্র সমাজকে চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
আরো বক্তব্য রাখেন পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনসংহতি সমিতি দীর্ঘ দুই যুগের অধিক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম পরিচালনা করে শাসকের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। এতে শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়েছিল চুক্তিতে উপনীত হতে। জুম্ম জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে এম এন লারমা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। মহান নেতার আদর্শকে ধারণ করে আমাদের সংগ্রামকে বেগবান করতে হবে। তিনি বলেন, আজকে আমরা বর্তমান বান্দরবানের কুরুক পাতার ম্রোদের বাস্তবতা দেখলেই অনুধাবন করতে পারি পাহাড় থেকে আমাদের অস্তিত্বকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য বিভিন্ন মৌলবাদী গোষ্ঠী শিক্ষা, চিকিৎসার সেবার নামে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে এবং বান্দরবানে কেএনএফ সন্ত্রাসী দমনের নামে নিরীহ বমদের উপরে দীর্ঘ সময় ধরে হত্যা ও বিনাবিচারে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংগঠন হলো লক্ষ্য পূরণের মূল হাতিয়ার। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র সমাজকে অবশ্যই অধিকতর আন্দোলনে সামিল হতে হবে। পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রমকে প্রতিহত করতে জুম্ম তরুণ ছাত্র সমাজকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। অবশেষে তিনি বমদের নিশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে তার বক্তব্য সমাপ্তি করেন।
বিশেষ অতিথি পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বান্দরবান জেলা শাখার সহ-সভাপতি রেং এম ময় বম বলেন মহান পার্টি জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে পাহাড়ের জনগণ দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এই রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু এই রাষ্ট্রের কোনো সরকার চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হলো পাহাড়ে আদিবাসীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দলিল। বিপরীতে সরকার বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে চাই। তাই পাহাড়ের ছাত্র সমাজকে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
উলিসিং মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ যুগ যুগ ধরে কারাগারে বন্দী অবস্থায় রয়েছে। এই বন্দীশালা থেকে মুক্তির উপায় হলো আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত করা৷ আর এই আন্দোলন সংগ্রাম করতে প্রয়োজন সংগঠন ও সঠিক নেতৃত্ব। পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী পরিষদ হলো জুম্ম ছাত্র সমাজকে একমাত্র নেতৃত্বদানকারী সংগঠন।
তিনি আরও বলেন, ৭২ এর সংবিধান রচনাকালে এই শাসকগোষ্ঠী আমাদের বাঙালি বানিয়েছিল এবং এখনো অব্দি জুম্মদের বাঙালিকরণ প্রক্রিয়াসহ নানাভাবে জুম্মদের অস্তিত্ব ধ্বংস করতে শাসকগোষ্ঠী মরিয়া হয়ে পড়েছে। সেই কারণে এম এন লারমার নেতৃত্বে আন্দোলন সূচিত হয়েছে এবং তারই ফলস্বরূপ পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেই। তাই চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে বৃহত্তর আন্দোলনে ছাত্র সমাজকে অধিকতর সামিল হতে হবে।
আলোচনা সভা শেষে ২২ তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিলে উশৈহ্লা মারমাকে সভাপতি, এডিশন চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক এবং রংথোইন ম্রো কে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ২৯ সদস্য বিশিষ্ট বান্দরবান জেলা শাখা কমিটি গঠন করা হয়। একই সাথে রনি ত্রিপুরাকে সভাপতি, মংক্যওয়াং মারমাকে সাধারণ সম্পাদক এবং জেকিপ্রু মারমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট পিসিপি বান্দরবান সরকারি কলেজ শাখা কমিটি গঠন করা হয়। নবনির্বাচিত কমিটিদ্বয়কে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমা।


