অগাস্টিনা চাকমা জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫ তম অধিবেশনে আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ে মানবাধিকার সংলাপে বক্তব্য প্রদান করেন।

আইপিনিউজ, ২৪ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক সংবাদঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমা ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে (নিউইয়র্ক সময় বিকাল ৫:৫৪ মিনিটে) জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআইআই) ২৫তম অধিবেশনে এজেন্ডা আইটেম ৫(ডি) শিরোনামে— “আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনকারী এবং আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রক্রিয়ার সাথে মানবাধিকার সংলাপ; সাধারণ সুপারিশ নং ৩৯ (২০২২) বাস্তবায়নের অগ্রগতির বার্ষিক পর্যালোচনা”— বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।
একই দিনে সকালে, কানাডার সিএইচটি আদিবাসী জনগণের কাউন্সিলের প্রতিনিধি খোকন চাকমাও আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর, নিউইয়র্কে ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইউএনপিএফআইআই-এর ২৫তম অধিবেশন শুরু হয়েছে এবং এটি ১ মে ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
এই অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর তিনজন প্রতিনিধি— চঞ্চনা চাকমা, অগাস্টিনা চাকমা এবং প্রীতি বিন্দু চাকমা— অংশগ্রহণ করছেন। এছাড়া, বাংলাদেশ থেকে আদিবাসী জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এআইপিপির মহাসচিব পল্লব চাকমা, আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রক্রিয়া (EMRIP)-এর ড. বিনোতা ময় ধামাই এবং এআইওয়াইপি-এর টনি চিরানও অধিবেশনে অংশগ্রহণ করছেন।
তার বক্তব্যে অগাস্টিনা চাকমা বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারী ও শিশুরা প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে ওঠে এই অনিশ্চয়তা নিয়ে যে তারা পরবর্তী হামলা থেকে বাঁচতে পারবে কিনা। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে দেওয়া আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভূমির মালিকানা এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিগুলো ভেঙে পড়েছে, যার ফলে তারা প্রতিনিয়ত সহিংসতা ও বঞ্চনার মুখোমুখি হচ্ছে।”
২০২৫ সালে মোট ২৬টি সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে—যার মধ্যে ধর্ষণ, অপহরণ এবং হত্যার মতো নৃশংসতা রয়েছে। খাগড়াছড়িতে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে, এবং এর প্রতিবাদ জানালে জুম্ম সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২০২৫ সালের ৫ মে এক খিয়াং গৃহবধূকে বাঙালি শ্রমিকদের দ্বারা ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, কিন্তু এ ঘটনার কোনো জবাবদিহিতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি চলমান ধারাবাহিকতার অংশ। জুম্ম নারী ও শিশুরা এখনো দায়মুক্তি, সহিংসতা এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়ে চলেছে। জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণা (UNDRIP) এবং সিডও (CEDAW)-এর সাধারণ সুপারিশ ৩৯ থাকা সত্ত্বেও এসব অধিকার উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে? আর কত নারী ও শিশুকে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার ছাড়াই এমন ভয়াবহতা সহ্য করতে হবে? আমরা জুম্ম জনগণ দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছি—পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছি।
আমরা আর একই চক্রে ঘুরপাক খেতে পারি না—প্রতিবছর একই দাবি জানিয়ে যেতে পারি না: নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং পরিবর্তন—কিন্তু কোনো বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া।
তিনি ফোরামের প্রতি নিম্নলিখিত আহ্বান জানান—
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা তদন্তের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনকারীর ম্যান্ডেট শক্তিশালী করা, যাতে তাৎক্ষণিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
২. চলমান সহিংসতা পর্যবেক্ষণ এবং জুম্ম নারী ও শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
৩. এনজিও এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে জুম্ম নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।
৪. মানবাধিকার রক্ষাকারীদের—বিশেষ করে নারী অধিকারকর্মীদের—নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা, যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ন্যায়বিচারের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।
৫. যৌন সহিংসতার শিকারদের জন্য সমন্বিত সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা, যার মধ্যে চিকিৎসা সেবা, মানসিক-সামাজিক সহায়তা এবং আইনি সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে তারা পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
উপসংহারে তিনি বলেন, “এটি শুধু নীতির বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। জুম্ম জনগণের জন্য প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণই রয়ে গেছে—আরেকটি বছরের ভাঙা প্রতিশ্রুতি। কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া আরও নারী ও যুবক প্রাণ হারাবে এবং আরও অনেক সম্প্রদায় হারিয়ে যাবে।”
