পিসিপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে জিকো চাকমা, অন্তর চাকমা ও শৈসানু মারমা

আইপিনিউজ বিডি, ২১ মে, রাঙ্গামাটিঃ “সকল প্রকার ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হউন”- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ ২১ মে ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) রাঙ্গামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের প্রতিনিধি সম্মেলন ও ৩০তম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে তিন পার্বত্য জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয়, থানা, কলেজ, শহর, ইউনিয়ন কমিটি থেকে প্রায় তিন শতাধিক প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক অংশগ্রহণ করেন।
প্রতিনিধি সম্মেলন ও ৩০তম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমার সঞ্চালনায় এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি শ্রী ঊষাতন তালুকদার, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক যুবনেতা সুমিত্র চাকমা প্রমুখ। প্রথম অধিবেশনের শুরুতে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রামে আত্মত্যাগী বীর শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রথমে অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য উনাইশৈ মারমা এবং আর্ন্তজাতিক, জাতীয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সাংগঠনিক অবস্থা ও আর্থিক প্রতিবেদন সম্বলিত সামগ্রিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা।
ঊষাতন তালুকদার বলেন, পিসিপি জুম্ম ছাত্রদের একটি প্রগতিশীল ও অগ্রগামী সংগঠন। ছাত্রদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করে পিসিপিকে মজবুত হতে হবে, আগামী দিনের লড়াইয়ে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অগ্রগামী ছাত্র সমাজকে সুবিধাবাদী চিন্তাভাবনা, পেটিবুর্জোয়া মানসিকতা পরিহার করে জুম্ম জনগণের জন্য ত্যাগী ও সংগ্রামী মানসিকতাকে বলীয়ান করতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যায় নয় কর্ম ও আদর্শের সম্মিলনের মাধ্যমে ছাত্র সমাজকে গড়ে উঠতে হবে। ছাত্র ও যুব সমাজ যুগে যুগে সমাজ-জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে পথ দেখিয়েছে। শিক্ষার লক্ষ্যই হলো সমাজের অভ্যন্তরে জমে থাকা সমস্যা ও অসংগতিকে সমাধান করে মানবিক মানুষের সমাজ গঠন করা। সমাজের প্রতি উদাসীন থেকে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। সামাজিক দায়বদ্ধতাই মানুষকে পরিপূর্ণ করে। এই সামাজিক দায়বদ্ধতার সঠিকভাবে পরিপূরণ সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় ছাত্র সমাজের সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে শাণিত করা তথা সমাজ পরিবর্তনের দায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া। অস্তিত্ব সংকটের এই কঠিন বাস্তবতা জুম্ম জনগণকে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখবে নাকি মুছে দেবে তা নির্ভর করছে তরুণ প্রজন্মের উপর। তরুণদের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। জুম্ম জনগণের সামগ্রিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনই তরুণদের এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আদর্শিক ঐক্য নিয়ে পিসিপিকে তার সেই দায়িত্ব পালন করে আগামী দিনের সংগ্রামে অবিচল থেকে জুম্ম জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
যুবনেতা সুমিত্র চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত জাতিগত দমন-পীড়ন চলছে। শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে মুছে দিতে চায়। আমাদের ছাত্র যুবাদের তাই প্রতিরোধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার মোকাবিলা করতে হবে। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জুম্ম ছাত্র তরুণদের কান্ডারি সংগঠন হিসেবে এই সংগঠনকে তার সুশৃঙ্খল কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জুম্ম ছাত্র সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার মাধ্যমে পাহাড়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে।
দ্বিতীয় অধিবেশনে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি রুমেন চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শ্রী জুয়েল চাকমা, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্রীমতি আশিকা চাকমা প্রমুখ। অধিবেশনে বিদায়ী কমিটির পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমা।
দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরুতে বিদায়ী কমিটির পক্ষ থেকে ১৩ দফা প্রস্তাবনা পেশ করেন বিদায়ী কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা এবং সেই প্রস্তাবনা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
জুয়েল চাকমা বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি ছাত্র সমাজ সর্বদা অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের চরম মূহুর্তে ১৯৮৯ সালের পিসিপির জন্ম জুম্ম জনগণের আন্দোলনে এক মাইলফলক। যার মধ্য দিয়ে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতরভাবে সংগঠিত হয়েছে, সংগ্রামী হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে মুছে দিতে বাঙালিকরণের প্রচেষ্টা করেছে, তারাই ধারাবাহিকতায় আশির দশকে সেটেলার পূনর্বাসন ও বর্তমান সময়ের ইসলামীকরণের নগ্ন রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তরুণ প্রজন্মকে তাই আজকে অস্তিত্বের প্রশ্নকে মীমাংসায় এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ছাত্র সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে মুচে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র ছাত্রসমাজ রুখে দাঁড়িয়েছিল। জুম্ম জনগণের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে ছাত্র সমাজ এগিয়ে এসে তাদের মহান দায়িত্ব পালন করেছিল। আন্দোলনের প্রত্যকটি পদে ছাত্রসমাজ তাঁর দায়িত্ব পালনে কোনদিন পিছপা হয়নি। জুম্ম জনগণের ক্রান্তিলগ্নে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত। অনাগত প্রজন্মের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করতে কাজ করে যাওয়া আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
নারীনেত্রী আশিকা চাকমা বলেন, পাহাড়ের বাস্তবতায় বর্তমান সময়ে জুম্ম নারীরা অনেক বেশি নিরাপত্তাহীনতা তথা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকেই আগামী প্রজন্মের সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। সমাজের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা তথা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সমাজের সকল স্তরের মানুষের পাশাপাশি নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যেতে হবে। সেই দায়িত্বটা আজকের অগ্রগামী ছাত্র সমাজের। নারী পুরুষ সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণই জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে বেগবান করবে।
কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও প্রতিনিধি সম্মেলনের অধিবেশনে পিসিপি’র বিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমা কমিটির ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট ৩০তম কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত কমিটিকে উপস্থিত প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত করে মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানান।
কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ৩০তম কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে জিকো চাকমা, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অন্তর চাকমা এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সৈসানু মারমাকে নির্বাচিত করে গঠিত ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট নব নির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান বিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি জগদীশ চাকমা।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় অধিবেশনের সভাপতি ও বিদায়ী ২৯তম কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রুমেন চাকমা দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।


