পার্বত্য চুক্তির আলোকে পার্বত্য এলাকায় বিশেষ শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনিঃ সন্তু লারমা

আইপিনিউজ বিডি, ১১ জুন, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ আজ (১১ জুন ২০২৬) বৃহস্পতিবার সিএইসটি হেডম্যান নেটওয়ার্ক সম্মেলন ২০২৬ রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাকমা সার্কেল চীফ রাজা দেবাশীষ রায়, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার এবং রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সন্তু লারমা বলেন, “আমরা পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ শাসনব্যবস্থা আশা করেছিলাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং প্রথাগত নেতৃত্ব—এসব নিয়েই পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ শাসনব্যবস্থার কাঠামো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রাখা উচিত ছিল, সেই ভূমিকা রাখতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এখানে প্রথাগত নেতৃত্বও তাদের দায়দায়িত্ব পালনে নানাভাবে দ্বিধাগ্রস্ত ও বাধাগ্রস্ত। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, বাহাত্তরের সংবিধান প্রণীত হলো; কিন্তু সেখানে পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের তের ভাষাভাষী ১৪টি জাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হলো এবং বাংলাদেশে বসবাসকারী সবাইকে বাঙালি হিসেবে পরিচিত করা হলো। এক কলমের খোঁচায় বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের জুম্ম জনগণের জাতীয় পরিচিতিকে অস্বীকার করা হলো। সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করা হলো এবং অপারেশন দাবানল পরিচালিত হলো।”
তিনি আরও বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন প্রশাসন এবং প্রথাগত নেতৃত্ব রয়েছে। কিন্তু তাদের ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে নানাধরনের বাধার সম্মুখীন হতে আমরা দেখেছি। অপারেশন দাবানল চলতে চলতে ২০০১ সালে এসে অপারেশন উত্তরণ জারি করা হলো। আজ পর্যন্ত অপারেশন উত্তরণ পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণকে চেপে ধরে রেখেছে। আমরা বিভিন্ন সরকারের মুখোমুখি হয়েছি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ১৯৮০-এর দশকে চার লক্ষাধিক বহিরাগত সেটেলারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়। পরবর্তীতে চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও এই সরকারের তেমন কোনো ইতিবাচক ভূমিকা আমরা দেখিনি।
১৯৯০-৯১ সালেও পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যে উদ্যোগ ও আলোচনা হয়েছিল, বিএনপি সরকার তা ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। জনসংহতি সমিতি জুম্ম জনগণের পক্ষে যে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল, বিএনপি সরকার তা গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।”
রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, “চুক্তির আলোকে প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জেলা পরিষদগুলোকে ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়েছে। আমি যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভায় যাই, তখন মনে হয় যেন আমি অন্য গ্রহ থেকে এসেছি। কারণ, সেখানকার আমলারা চুক্তির কথা জেনেও না জানার ভান করেন। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয়। তাহলে কি আজ আমলারা চান না যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত হোক?”
তিনি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম অন্তত শিক্ষক নিয়োগটি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারব। কিন্তু তা পারিনি।”
চাকমা সার্কেলের চিফ দেবাশীষ রায় বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত নেতৃত্বের অবস্থান ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আজকের এই সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পক্ষে এবং এর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সবাই একত্রিত হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।”
এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় “প্রচলিত ভুমি ব্যবস্থাপনা প্রথাগত নেতৃত্বের ভূমিকা ও করণীয় প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও বর্তমান অবস্থা” ।আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ হলরুমে তিন পার্বত্য জেলায় সকল প্রথাগত নেতৃত্বের উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক সম্মেলন -২০২৬ এ আরও উপস্থিত ছিলেন সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ সভাপতি এডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, বান্দরবান পার্বত্য জেলা হেডম্যান এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শ্রী টিমপ্রু মারমা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা হেডম্যান এসোসিয়েশনের সভাপতি শ্রী সুবলক্ষন চাকমা, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা হেডম্যান এসোসিয়েশনের সহসভাপতি শ্রী থোয়াইঅং মারমা, বান্দরবান বোমাং সার্কেল হেডম্যান কারবারি কল্যাণ পরিষদের সহ সভাপতি শ্রী থোয়াইংহ্রী মারমা,মিজ জয়া ত্রিপুরা সভাপতি সিএইচটি নারী হেডম্যান কার্বারী নেটওয়ার্ক, সাংগঠনিক সম্পাদক সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্ক ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ,মিজ রওশন জাহান মনি উপ- নির্বাহী পরিচালক এএলআরডি, ঢাকা , রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান পার্বত্য পার্বত্য জেলা হেডম্যান, কার্বারীবৃন্দ।


