বিশেষ প্রতিবেদনশিক্ষা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি অডিটোরিয়ামে পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ঢাকাঃ “শেকলে বাধা বন্দী জীবন,বিবর্ণ পাহাড়,অস্তিত্ব রক্ষাই হোক নবীনের দৃপ্ত অঙ্গীকার”এই স্লোগানকে সামনে রেখে গতকাল ২৪ জুলাই ২০২৬ রোজ শুক্রবার পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে “নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ২০২৬” অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল: ৩.০০ ঘটিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকাস্হ বিভিন্ন পাবলিক,প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়,নার্সিং,পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫ -২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।।
‎পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক হ্লামংচিং মারমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি কনেজ চাকমা।

‎উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন)অধ‍্যাপক ড.মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ‍্যাপক ড.রাশেদা রওনক খান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত‍্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় স্টাফ সদস‍্য :শ্রী ত্রিজিনাদ চাকমা। পার্বত‍্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি জিকো চাকমা। হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তথ‍্য,প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক চন্দ্রিকা চাকমা।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব‍্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক পাতলাই ম্রো এবং অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগর শাখার সদস্য কলি চাকমা। এছাড়াও নবীন শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব‍্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২৫-২৬সেশনের নবীন শিক্ষার্থী উটিংটিং মারমা

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী তার বক্তব্য- নবীন বরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত তিন দফা দাবির বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন

তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষাজীবনে গবেষণার পাশাপাশি সেখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানার সুযোগ হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী তাদের জীবন পরিচালনা করে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য পাহাড়ী শিক্ষার্থীরা যে সংগ্রাম করে এগিয়ে আসছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং সৌভাগ্যের বিষয়।”
বর্তমান সরকার শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কোনো আদিবাসী শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অর্জন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, “রাষ্ট্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে যে বৈষম্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে রেখেছে, একদিন তারা অবশ্যই সেই অবস্থা থেকে মুক্ত হবে।”
তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অনেক পাহাড়ী শিক্ষার্থী মাতৃভাষা ভিন্ন হওয়ায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা উচ্চারণে শুরুতে কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হয়। তবে এ নিয়ে হতাশ না হয়ে শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে এবং শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে।
ড. রাশেদা রওনক খান পাহাড়ী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবসময় তাদের পাশে থাকবেন এবং শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যক্তিগত বিকাশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবেন।

জিকো চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের রূঢ় বাস্তবতা পেরিয়ে যেসকল নবীন শিক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নের যোগ্যতা অর্জন করেছেন তাদের হৃদয়ে শেকড়ের প্রতি নাড়িরটান ধারণ করতে হবে। অধ্যয়ন শেষে সুশিক্ষিত এবং সুনাগরিক হয়ে শিকড়ে ফিরে সমাজ পরিবর্তনে এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ছাত্র সমাজকে দৃপ্ত ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসীদের অন্যতম সামাজিক উৎসবসূহে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে ছুটির ব্যবস্থা না থাকায় আদিবাসী শিক্ষার্থীরা উৎসবের আমেজ থেকে বঞ্চিত হন। এসময় তিনি আদিবাসীদের সামাজিক উৎসবসমূহে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে ছুটির ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

ত্রিজিনাদ চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, জাতীয় জীবনে ছাত্র সমাজের আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ অনুভব করতে হবে। বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকায় অধ্যয়নরত প্রতিটি জুম্ম শিক্ষার্থী একেকজন বার্তা বাহক। জুম্ম জনগণের ওপর সংগঠিত হওয়া নিপীড়ন, নির্যাতনের বার্তাগুলো সমতলের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পূর্বসূরীদের দীর্ঘ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা রাজধানী ঢাকার বুকে শিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছি৷ দীর্ঘ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস আমদের জানতে হবে। এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে অর্জিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে তরুণ ছাত্রসমাজকে ঐতিহাসিক গুরুদায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে

চন্দ্রিকা চাকমা বলেন, নবীনরা পাহাড়ের একেকটি বুনোফুল। আজ নবীনদের পদচারণায় রাজাধানী ঢাকার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্দোলিত। তিনি সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে ছাত্রসমাজকে এমএন লারমার আদর্শ ধারণ করে জুম্ম জনগণের অধিকার এবং অস্তিত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। বক্তব্যে তিনি সমাজে নারীদের সম অধিকার, সমমর্যাদা এবং নারী শিক্ষার গুরুত্বারোপ করেন।

সভাপতির বক্তব্য কনেজ চাকমা বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে আজকে আয়োজিত এই নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ঢাকায় বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আদিবাসী জুম্ম ছাত্র সমাজের মধ্যে যে ভাতৃত্বের বন্ধন, জাতির প্রতি চিন্তা- ভাবনা ও ভালোবাসা গুলোকে একত্র করতে ভুমিকা রাখবে। বর্তমানে পাহাড়ের বিদ্যামান বাস্তবতায় আধুনিক জ্ঞান ও ধ্যাণ-ধারণা সম্পন্ন শিক্ষিত প্রগতিমনা প্রজন্মের নিজের শেখরকে চেনা-জানা অবশ্যই দায়। সে লক্ষ্য নিজের শেখরের টানে এগিয়ে আসা অবশ্য প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

তিনি বলেন, এমএন লারমা যে চেতনা – যে উদ্দেশ্য নিয়ে “শিক্ষিত হও, গ্রামে ফিরে চলো” কথা বলেছিলেন সেটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অবশ্যই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। উনাদের প্রজন্মরা পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটেছেন। চেতনার মশাল জ্বালিয়েছেন, অধিকার সচেতন এক প্রজন্ম তৈরি করেছেন। উনার সে পথের পথিক হয়ে শিক্ষিত প্রজন্ম যেন সচেতন হয়ে অনাগত ভবিষ্যতে জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি জুম্ম জাতির প্রতি নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য বুঝার সক্ষমতা রাখতে পারে সেই শিক্ষাই হোক প্রজন্মের প্রকৃত শিক্ষা।
তিনি আরো বলেন,পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বিশ্বাস করে যুগে যুগে জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে প্রগতিশীল,দেশপ্রেমিক, শিক্ষিগ জুম্ম ছাত্র সমাজ জাতির হাল ধরবে। সে লক্ষ্য সবসময় জুম্ম ছাত্র সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান রাখেন।

নবীন বরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক হ্লামংচিং মারমার উত্থাপিত ১.ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী সেন্টার প্রতিষ্ঠা ২.ভাষা বিজ্ঞান বিভাগে আদিবাসী ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু) দাবির বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।

Back to top button