রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে পিসিপি ও এইচডাব্লিউএফ’র নবীন বরণ ও কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ২০২৬ অনুষ্ঠিত।

আইপিনিউজ বিডি, ২৩ জুলাই, ২০২৬, রাঙ্গামাটিঃ আজ ২৩ জুলাই ২০২৬ রোজ বৃহস্পতিবার “আলোর দিশারী নবীন হে নবীণ প্রাণ, চেতনায় জাগরিত রেখো শেকড়ের টান” এই স্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন, রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার যৌথ উদ্যোগে “নবীন বরণ ও কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ২০২৬” অনুষ্ঠিত হয়।সকাল ১০ ঘটিকায় রাঙ্গামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত ২০২৫ -২০২৬ শিক্ষাবর্ষের এইচএসসি ১ম বর্ষ ও স্নাতক ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীন বরণ ও কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার পিসিপি’র সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিত চাকমা ও এইচডাব্লিউএফ’র সাধারণ সম্পাদক সুষ্টি চাকমার যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি জ্ঞান চাকমা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সম্মানিত সদস্য অ্যাডভোকেট চঞ্চু চাকমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অনির্বাণ বড়ুয়া, এইচডাব্লিউএফ, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি কবিতা চাকমা ও পিসিপি, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সহ-সভাপতি সুনীতি বিকাশ চাকমা প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি’র রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রিয়ন্তি চাকমা । নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করেন অর্নাসের শিক্ষার্থী ঐশী চাকমা এবং নবীনদের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রদান করেন এইচএসসি ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী কনন মহন চাকমা। অনুষ্ঠানে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট চঞ্চু চাকমা বলেন, শিক্ষা মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করতে পারে। শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক গন্ডিবদ্ধ শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবমুখী ও মানবিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সার্টিফিকেটে মোটা নাম্বার পেয়ে অনেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলে ও তাদের মধ্যে অহংকার ও স্বার্থবাদী চিন্তা থেকে যায়। শিক্ষার্থীদের মুক্ত বুদ্ধির চর্চার মাধ্যমে নিজের মধ্যে লড়াকু চেতনাকে ধারণ করে সমাজকে পরিবর্তন করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষাভাষির মানুষ থাকলেও একটি জায়গায় আমরা ঐক্যবদ্ধ অধিকার প্রশ্নে। শুধুমাত্র কাঠামোগত শিক্ষার মধ্যে থাকলে হবে না, বাস্তবতা আর শেকড়ের প্রতি টান থাকতে হবে। আমাদের মধ্যে চেতনা বোধ থাকতে হবে, আমরা সবাই জুম্ম। বর্তমান সমাজের বাস্তবতা ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, সেই পরিস্থিতি নবীনদের নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে। আন্দোলন সবাই করতে পারলেও, অধিকার সহজেই আদায় করা সম্ভব না। তা নবীনদের উপলব্ধি করতে হবে। মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। কিন্তু বর্তমানে আমাদের জুম্ম সমাজের একটি অংশের চেতনা বোধের অভাব, অলসতার কারণে আজ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এইগুলো বর্তমান তরুণদেরকে বুঝতে হবে, জানতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ২৪ বছর সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা যে চুক্তি করেছি বর্তমানে তা অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়ে গেছে। কারণ বর্তমান তরুণ সমাজের একটি অংশ অধিকারের প্রশ্নে এখনো সোচ্চার হয়নি। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আন্দোলন বহুমুখী হয়ে দাড়িয়েছে। বুকে সাহস নিয়ে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। তরুণ সমাজও হচ্ছে একটি সমাজের চালিকাশক্তি ও অগ্রদূত। আমাদের আর আত্মমুখী হলে চলবে না, অধিকারের জন্য আমাদের সামগ্রিক চিন্তাচেতনা লালন পালন করতে হবে।
অনির্বাণ বড়ুয়া বলেন, শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষ আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। ছাত্রজীবন হল জীবন গঠনের একটি প্রস্তুতি। এই ছাত্রজীবনেই একজন মানুষ যথাযথ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে জ্ঞানের সৎ মানবিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষকদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে নিজেকে সর্বক্ষেত্রে বিকশিত করে সঠিক পথে চলতে হবে। নবীনরা অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে ও তারা তাদের কাঙ্খিত সাফল্য লাভ করতে পারে না। নবীনরা যদি সচেতন না হলে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে না পারলে এই জাতির ভবিষ্যত অন্ধকার। মানুষের মতো মানুষ তথা আলোকিত মানুষ হওয়ার জন্য পড়ালেখায় মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষার্থীরা আজ অবহেলা উদাসীনতার জন্য ভালো ফলাফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভালো মানুষ হতে হলে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। আমাদেরকে প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো ব্যবহার করতে হবে, অন্যথায় আমাদের চিন্তা শক্তি হ্রাস পাবে, মেধা শক্তি তৈরি হতে পারবে না। আমাদের আচার-আচরণের ক্ষেত্রে সভ্যতা বজায় রাখতে হবে এবং একজন ছাত্র হিসেবে আমাদের যা করণীয় তাই মেনে চলতে হবে।
তিনি আরও বলেল, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে মানুষ লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। এইজন্য অধিকারের প্রশ্নে সবাইকে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন হতে হবে।

কবিতা চাকমা বলেন, শিক্ষা হলো এমন একটি উপকরণ যার মাধ্যমে একটি জাতিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম শিক্ষার্থীদের নানা বাস্তবতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। বর্তমান শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার চেয়ে মোবাইল ফোনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করে থাকে যা নেতিবাচক প্রভাব রাখে। জুম্ম শিক্ষার্থীদের পাহাড়ের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে মাতৃভূমি রক্ষায় সংগ্রাম করতে হবে।
সুনীতি বিকাশ চাকমা বলেন, শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব অর্জন হয়। একজন মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রথম জন্ম লাভ করে আর দ্বিতীয় জন্ম লাভ করে প্রকৃত মানুষ হিসেবে জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জনের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আমাদের জুম্ম শিক্ষার্থীদের নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা নেই বললেই চলে। শিক্ষার্থীদের শেকড়ের টানে নিজের জাতি, সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে জানতে হবে, ভাবতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট, শিক্ষা প্রয়োজনীয় উপকরণ সংকট সহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে। শিক্ষা সংক্রান্ত অধিকার সহ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় পিসিপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। জুম্ম শিক্ষার্থীদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে লড়াই সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন সংগ্রামে সামিল হতে হবে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের জুম্ম শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
