রেংমিটচ্য ভাষায় কথা বলা ছয়জনের একজনের মৃত্যু, অবশিষ্ট পাঁচজনের মধ্যে দুজন অসুস্থ; বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে বিরল মাতৃভাষা

আইপিনিউজ বিডি, ১৯ জুলাই, ডেক্স রিপোর্টঃ বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি বিশেষ গোত্রের মাতৃভাষা রেংমিটচ্য এখন চরম বিলুপ্তির মুখে। ভাষাটিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন মাত্র ছয়জন। তাদের একজন, মাংওয়াই ম্রো (৬৪) সম্প্রতি মারা গেছেন। ফলে বর্তমানে এ ভাষার সাবলীল বক্তার সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচজনে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জীবিত পাঁচজন বক্তার মধ্যে ষাটোর্ধ্ব বয়সী দুজনও অসুস্থ। ফলে ভাষাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষক ও ভাষাবিদরা।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনে রেংমিটচ্য ভাষার তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টেশন) নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন গবেষক আফসানা ফেরদৌস আশা। তিনি জানান, আলীকদম উপজেলার তৈনখালের ক্রাংসি পাড়ার কয়েকজন ম্রো বাসিন্দা তাকে ফোন করে মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যুর খবর জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাংওয়াই ম্রো দীর্ঘদিন ধরে লিভারের জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছর তিনি টাইফয়েডেও আক্রান্ত হন এবং নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করতেন। চলতি বছরের ৫ মে দুপুরে তিনি মারা যান। দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় তখন বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
গত বছর গবেষণার প্রয়োজনে টানা সাত মাস আলীকদমে অবস্থান করেন আফসানা ফেরদৌস আশা। সে সময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছয়জন রেংমিটচ্যভাষীকে নতুন করে শনাক্ত করে তাদের ভাষা, উচ্চারণ ও কথোপকথনের তথ্যচিত্র সংরক্ষণ করেন তিনি।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “মাংওয়াই ম্রোকে অনেক কষ্ট করে নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে আলীকদমের ক্রাংসি পাড়ায় নিয়ে এসেছিলাম। সেখানে তার দুই ভাইয়ের সঙ্গে বহু বছর পর পুনর্মিলন হয়েছিল। তারা খুব আনন্দিত হয়েছিলেন। এখন তার মৃত্যুর খবর মেনে নেওয়া খুব কঠিন। আর একজন ভাষাভাষীকেও হারালে সেটি হবে অপূরণীয় ক্ষতি।”
তিনি আরও জানান, রেংমিটচ্য ভাষার প্রায় ১ হাজার ৫০০ শব্দ নিয়ে একটি অভিধানধর্মী বইয়ের খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। জীবিত ভাষাভাষীদের সহায়তায় সেটির চূড়ান্ত সম্পাদনার কাজ বাকি রয়েছে।
এর আগে বিলুপ্তপ্রায় রেংমিটচ্য ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো দৈনন্দিন কথোপকথনভিত্তিক ‘মিটচ্য তখক’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। রেংমিটচ্য ভাষার নিজস্ব লিপি না থাকায় বইটি ম্রো ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়। ২৮ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থে তিন হাজারের বেশি শব্দ সংকলিত হয়েছে।
বইটি প্রকাশের সময় ইয়াংঙান ম্রো বলেছিলেন, “এই ভাষায় কথা বলতে পারেন মাত্র ছয়জন। তারা সবাই মারা গেলে রেংমিটচ্য ভাষাও পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। হয়তো তখন এই বইগুলোই ভাষাটির শেষ স্মারক হয়ে থাকবে।”
বর্তমানে রেংমিটচ্য ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন মাত্র পাঁচজন। তারা হলেন— আলীকদম সদর ইউনিয়নের ক্রাংসি পাড়ার মাংপুং ম্রো (৭৪), কুনরাও ম্রো (৬১), আরেক কুনরাও ম্রো (৭৪), নয়াপাড়া ইউনিয়নের মেনসিং পাড়ার থোয়াই লক ম্রো (৬০) এবং নাইক্ষ্যংছড়ি ইউনিয়নের ওয়াইবট পাড়ার রেংপুং ম্রো (৭০)। এদের মধ্যে কুনরাও ম্রো নামে দুজনই নারী, বাকিরা পুরুষ।
ভাষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট এই পাঁচজন বক্তাকেও হারালে রেংমিটচ্য ভাষা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তবে বিপন্নপ্রায় ভাষাটিকে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাজ করছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। ভাষাটির তথ্যচিত্র, শব্দভান্ডার ও মৌখিক ঐতিহ্য নথিভুক্ত করে এর ভাষাগত কাঠামো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের একটি অংশের ধারণা, রেংমিটচ্যভাষীরা একসময় স্বতন্ত্র একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছিলেন। সময়ের প্রবাহে ম্রো ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তারা ধীরে ধীরে ম্রো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যান এবং ম্রো পরিচয় গ্রহণ করেন। তবে তাদের ভাষা আজও সেই স্বতন্ত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।


