আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনন্য উৎসব কারাম পরব

আইপিনিউজ বিডি, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব কারাম পূজা বা কারাম পরব।
প্রকৃতি, কৃষি, পারিবারিক মঙ্গল, সামাজিক সম্প্রীতি ও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এ উৎসব। ভাদ্র মাসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কারাম পূজা উদযাপন করা হয়। উৎসবের প্রধান প্রতীক কারাম গাছের ডাল, যা নির্দিষ্ট নিয়মে সংগ্রহ করে পূজাস্থলে স্থাপন করা হয়। পূজার আগে অনেকেই উপবাস পালন করেন এবং পরে কারাম ডালকে ঘিরে প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করেন।
ভালো ফসল, পরিবার ও সমাজের মঙ্গল, সুখ-সমৃদ্ধি এবং অভাব-অনটন থেকে মুক্তির জন্য এ সময় প্রার্থনা করা হয় উত্তরাঞ্চলের নওগাঁয় কারাম পূজাকে ঘিরে প্রতিবছর বড় ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে থাকে। মহাদেবপুর, পত্নীতলা, পোরশা ও বদলগাছীসহ বিভিন্ন এলাকায় কারাম উৎসবকে কেন্দ্র করে নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলেও মুন্ডা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন আদিবাসী পল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে কারাম পূজার ঐতিহ্য চলে আসছে।
পশ্চিম ঘনশ্যামপুর, পূর্ব ভোলাপাড়া, পূর্ব ঘনশ্যামপুর, বাকসা সুন্দরপুর, সিদলী ও ভাংবাড়ী পাড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দিনাজপুর, রংপুর ও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও স্থানীয় রীতি অনুযায়ী কারাম উৎসব পালিত হয়।
রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহান, মাহাতো ও মুন্ডাসহ বিভিন্ন জাতিসত্তা এ উৎসব পালন করে।
খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকাতেও কারাম বা করম উৎসব পালনের ঐতিহ্য রয়েছে। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের চা-বাগান এলাকাতেও করম বা কারাম উৎসবের প্রচলন রয়েছে। কারাম পূজার সঙ্গে ধর্মা ও কর্মা নামে দুই ভাইয়ের লোককাহিনিও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিচ্ছা, লোকগান, মাদলের তালে নৃত্য ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এ কাহিনি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়।
কারাম উৎসব তাই শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মৌখিক সাহিত্য, লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যম।আধুনিকতার প্রভাবে নানা লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে কারাম পূজা নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখছে।অঞ্চলভেদে রীতি ও আনুষ্ঠানিকতায় পার্থক্য থাকলেও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের মঙ্গল ও সামাজিক বন্ধনই এ উৎসবের মূল বার্তা।
কারাম পূজার মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসব সংরক্ষণ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।


