আন্তর্জাতিক

UNPO-এর সাধারণ অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও অঞ্চলকে সামরিকীকরণমুক্ত করার আহ্বান

আইপিনিউজ বিডি, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অনুষ্ঠিত ইউনাইটেড নেশনস অ্যান্ড পিপলস অর্গানাইজেশন (UNPO)-এর ২১তম সাধারণ অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম (CHT) বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (CHT Accord) বাস্তবায়নের পাশাপাশি অঞ্চলটিকে সামরিকীকরণমুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

UNPO-এর ২১তম সাধারণ অধিবেশন ২৯–৩০ আগস্ট নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS)-এর প্রতিনিধি হিসেবে অধিবেশনে অংশ নেন প্রীতি বিন্দু চাকমা ও এনজেবি চাকমা।

গতকাল শনিবার (২৯ আগস্ট) সাধারণ অধিবেশনের প্রথম দিনের কার্যক্রমে PCJSS-এর প্রতিনিধি প্রীতি বিন্দু চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবটি উপস্থাপনের পর সাধারণ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়।

প্রস্তাবে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর অতিবাহিত হলেও চুক্তির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধারা, যার মধ্যে মূল বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এখনো অর্জিত হয়নি। একই কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রস্তাবিত বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাও যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতিরও কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারগুলো ব্যাপক সামরিকীকরণ ও ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমনমূলক নীতি অনুসরণ করে আসছে।

বিশ্বের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অন্যতম সামরিকীকৃত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে প্রস্তাবে বলা হয়, এ অঞ্চলে ৪০০টিরও বেশি অস্থায়ী সামরিক ক্যাম্প রয়েছে। পাশাপাশি ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর মাধ্যমে কার্যত সামরিক শাসনব্যবস্থাও সেখানে সক্রিয় রয়েছে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, এর ফলে জুম্ম জনগণের ওপর দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সেনাবাহিনী-সমর্থিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাধ্যমে চুক্তির পক্ষের ও নিরীহ জুম্ম জনগণের ওপর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘অস্ত্রধারী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া বাঙালি সেটেলার ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উসকে দিয়ে জুম্ম জনগণের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা, অযথা হয়রানি, জুম্ম জনগণের মালিকানাধীন ভূমি অবৈধভাবে দখল, চুক্তিবিরোধী কর্মকাণ্ড জোরদার করা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্মান্তরকরণ এবং আদিবাসী নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতার মতো ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।

উল্লিখিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে ২৯–৩০ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত UNPO-এর ২১তম সাধারণ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বান জানানো হয়—

ক. বাংলাদেশ সরকারের প্রতি:

১. ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা;

২. পার্বত্য চট্টগ্রামকে সামরিকীকরণমুক্ত করার লক্ষ্যে ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর মাধ্যমে কার্যকর থাকা সামরিক শাসনব্যবস্থাসহ এ অঞ্চলের সব অস্থায়ী সামরিক ক্যাম্প প্রত্যাহার করা; এবং

৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বিধিমালা প্রণয়ন করে সব ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং জুম্ম জনগণের কাছ থেকে বেদখল হওয়া ভূমি তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।

খ. UNPO-সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি:

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপ প্রয়োগ করা;

২. পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত কোনো সেনাসদস্যকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা; এবং

৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি সরেজমিনে তদন্তের জন্য জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদককে (UN Special Rapporteur on the Rights of Indigenous Peoples) পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা।

গ. বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতি:

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তা করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা।

Back to top button