সেটেলার কর্তৃক জুম্ম নারী ও শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদে রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ সমাবেশ

আইপিনিউজ বিডি, ২৫ মে, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ “সারাদেশে অব্যাহত সকল ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতন ঘটনার দ্রুত ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত কর” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাঙ্গামাটিতে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক বিলাইছড়িতে জুম্ম ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, থানচিতে জুম্ম শিশুকে ধর্ষণ এবং রাজধানীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার প্রতিবাদে ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভ মিছিলটি রাঙ্গামাটির কুমার সমিত রায় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গন থেকে শুরু হয়ে বনরুপা পেট্রোল পাম্প প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে এসে শেষ হয় এবং প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবাদী সমাবেশে এইচডাব্লিউএফ’র রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এলি চাকমার সঞ্চালনায় পিসিপি, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি সুমন চাকমার সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সজল চাকমা। এছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির রাঙ্গামাটি জেলার কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা, পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা, এইচডাব্লিউএফ’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কবিতা চাকমা, রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী লীলা চাকমা প্রমুখ।
যুবনেতা সুমিত্র চাকমা বলেন, এই রাষ্ট্র ধর্ষককে আশ্রয় দেয় যার উদাহরণ আমরা দেখি বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদ সমাবেশে সাধারণ জনগণ যখন ধর্ষণের প্রতিবাদ করতে যায় তখন বিজিবিকে সেখানে জনগণের দিকে বন্দুক তাক করেছে। বিজিবি হলো বাংলাদেশের সীমান্তের পাহাড়াদার। জনগণের টাকায় জনগণের স্বার্থে সীমান্ত রক্ষার জন্য তাদের সে অস্ত্রগুলো দেওয়া হয়েছে অথচ তারা সেই বন্দুক উঁচিয়ে জণগণকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মিছিলে বাঁধা দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ধর্ষকদের স্থান মুক্তভাবে দেশে ঘুরে বেড়ানো নয়, ধর্ষকদের স্থান হলো জেলখানায় আর এর চূড়ান্ত শাস্তি হলো ফাঁসি। রাষ্ট্র যদি এসব অসামাজিক কার্যকলাপগুলো বন্ধ করতে না পারেন, ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে না পারেন তাহলে তাদের বিচার করতে বাধ্য হবে। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক বিশেষ শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।
অন্তর চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারী ধর্ষণের ঘটনা যেন রুটিনমাফিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। এসবের একটিই কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। পূর্বে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনায় আমরা প্রশাসনের যথাযথ কোন বিচারের যথাযথ পদক্ষেপ আমরা আজও দেখি না। অপরাধীদের ধরার জন্য যদি প্রশাসন তৎপর হতো তাহলে এসব ঘটনা সংঘটিত হতো না। বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ দিনের মধ্যে রামিসা ধর্ষণের ঘটনার তদন্ত এবং ধর্ষণের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন আমরা তাঁর সাধুবাদ জানাই।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ও আমরা এসব ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার বিচার যথাযথ ও দ্রুত দেখতে চাই। পার্বত্য চট্টগ্রামে চিংমা খেয়াং-এর ধর্ষণ ও তার পরবর্তী হত্যার ঘটনার এক বছর পরে ও কোনো বিচার হয়নি। বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের জুম্ম শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদে জনসাধারণ সমবেত হলে সেখানে বিজিবি কর্তৃক বাধা প্রদান করা হয়। বিজিবির কাজ হলো সীমান্ত রক্ষা করা, সমাবেশে বাধা প্রদান করা নয়। অথচ বান্দরবানে মায়ানমার বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরসার পুঁতে রাখা মাইনে ৩জন জুম্ম গ্রামবাসী নিহত হয়। অন্যদেশের বিদ্রোহী গোষ্ঠী এদেশে মাইন পুঁতে রাখছে তার বিরুদ্ধে বিজিবি কোনো ভূমিকা নাই।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এর সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অথচ চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়ে গেছে যার মধ্যে ভূমি সমস্যা অন্যতম। অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি কমিশন কার্যকর করার মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে।সরকার যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করে তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ বসে থাকবে না। তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দুর্বার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলবে।
কবিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যতগুলো ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে তা সংঘঠিত করেছে সেটেলার বাঙালি, যার একটিরও সুষ্ঠু বিচার হয়নি। প্রশাসনের মদতে মূলত এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। যার কারণে প্রশাসন এসব ঘটনার ব্যাপারে উদাসীন থাকে। স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন দাবানল এবং চুক্তির পরে অপারেশন উত্তরণ নামে সেনা শাসন জারি রাখা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
সাধারণ শিক্ষার্থী লিলা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনায় আমরা প্রশাসনের কোন কার্যকরী পদক্ষেপ দেখি না। উপরন্তু আমরা পাহাড়ে সেনা শাসন দেখতে পায়। পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্যে নিরাপত্তার নামে সেনা বাহিনীর নানারকম কার্যক্রম আমরা দেখতে পাই। সেনাবাহিনীর মদদে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক হত্যা, গুম, ধর্ষণ ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে চলেছে। আমাদের এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।


