জাতীয়বিশেষ প্রতিবেদন

চবিতে শহীদ মনতোষ, সমর বিজয়, সুকেশ ও রুপম চাকমার ৩০তম শহীদ দিবসে স্মরণসভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনু্ষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ২৮ জুন, ২০২৬, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মনতোষ, সমর বিজয়, সুকেশ ও রুপম চাকমার ৩০তম শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল ২৭ জুন ২০২৬ (শনিবার) মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক প্রেনঙি ম্রো’র সঞ্চালনায় এবং সহ-সভাপতি এনতেস চাকমার সভাপতিত্বে স্মরণসভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন পিসিপি, চবি শাখার সদস্য বিপুল তঞ্চঙ্গ্যা। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ চবি শাখার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বিজক চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক রিবেক চাকমা প্রমুখ।
সভার শুরুতে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামে এযাবৎ যারা যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের সকলের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

রিবেক চাকমা বলেন, জুম্ম জনগণের লড়াই সংগ্রামকে স্থিমিত করার অংশ হিসেবে কল্পনা চাকমা অপহরণ ও তার প্রতিবাদে অবরোধ করতে গিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ভিডিপি ও স্যাটেলারদের দ্বারা মনতোষ, সুকেশ, সমর বিজয় ও রুপম চাকমাদের হত্যা ও ঘুমের শিকার হতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে সংগ্রামী চেতনার নজির তারা স্থাপন করে গেছেন।

তিনি বলেন, আজ পর্যন্ত জুম্ম জনগণের লড়াই-সংগ্রাম পরিচালিত করতে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন পাহাড়ের বহু হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। এই লড়াইয়ের এক পর্যায়ে পার্বত্য চুক্তির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ সরকার আমাদের অস্তিত্ব ও স্বতন্ত্রতাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হলেও সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে জুম্ম জনগণের মতো উদারতা দেখাতে পারেনি। যার কারণে পাহাড়ের মানুষের আজও ভাগ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখল,জাতিগত নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ চুক্তির পূর্বের ন্যায় এখনো বহাল রয়েছে। পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো জটিল থেকে জটিলতর আকার ধারণ করছে। পাহাড়ী অধিবাসী জনগণকে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হচ্ছে। বর্তমান জুম্ম সমাজের এই কঠিন পরিস্থিতিতে অগ্রসর অংশ হিসেবে ছাত্র সমাজকে অবশ্যই এগিয়ে এসে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। জুম্ম জনগণকে শাসকগোষ্ঠী যে গলা টিপে রেখেছে এই বন্ধনকে ছিন্ন করতে হবে।

বিজক চাকমা বলেন, যুগে যুগে নিপীড়িত জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণোধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তরুণ প্রজন্ম তার লড়াকু ভূমিকা পালন করে গিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে ঘটে যাওয়া কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধে সমর বিজয় ও সুকেশ চাকমারা হত্যা ও ঘুমের শিকার হন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তাদের দমে না যাওয়া সংগ্রামের ভূমিকা তরুণ প্রজন্মকে লড়াইয়ে আরো অনুপ্রাণিত করে। বর্তমান সময়েও জুম্ম জনগণের ভাগ্যের আকাশে ঘনঘটা আরো ঘনীভূত হবে যদি না যুব সমাজ লড়াই-সংগ্রামে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত থাকে।

তিনি আরও বলেন, ১৯৯৭ সালে সাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির বহু বছর গড়িয়ে গেলেও বাংলাদেশের উগ্র জাত্যভিমানী ও সাম্প্রদায়িক সরকারের অনীহা ও জুম্ম স্বার্থ পরিপপন্থী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের কারণে জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক বিভাজন ধরিয়ে জুম্ম জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে চাই। এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করতে হবে। পাহাড়ে একদিন আলো জ্বলবে এই বিশ্বাস ও আস্থা আমাদের রাখতে হবে। শহীদদের আত্মবলিদানকে স্মরণ করে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাদের ঐক্য ও লড়াইকে আরো সুদৃঢ় করতে হবে।

স্বাগত বক্তব্যে বিপুল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে অসংখ্য বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে। এসব হত্যাকান্ডের মাধ্যমে যেসব বীরদের আমরা হারিয়েছি তার মধ্যে কল্পনা চাকমা অন্যতম। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তাঁকে নিজ বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। তারই প্রতিবাদে অবরোধ পালনকালে হত্যা ও গুমের শিকার হন শহীদ মনতোষ, সুকেশ, সমর বিজয় ও রুপমেরা। বর্তমানেও জুম্ম জনগণের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় ১৪ টি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার সনদ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মকে লড়াইয়ের কোন বিকল্প নেই। বহুমূখী সংগ্রামের অংশ হিসেবে আমাদেরকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইকে গুরুত্ব দিতে হবে। তারুণ্যের উদ্যম ও শক্তিকে জুম্ম জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। লড়াই-সংগ্রাম করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁরা শিখিয়ে গেছেন জুম্ম জনগণকে টিকে থাকতে হলে লড়াই-সংগ্রাম ব্যতীত অন্যকোন পথ আমাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই।
সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আয়োজিত মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও স্মরণসভাটির সমাপ্তি ঘটে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পাহাড়ের নারী নেত্রী কল্পনা চাকমা বাঘাইছড়ির নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য সালেহ আহমেদ ও মোঃ নুরুল হক কর্তৃক অপহৃত হন। কল্পনা চাকমা হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে অপহরণের ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ১৯৯৬ সালের ২৭ জুন কল্পনা চাকমা অপহরণের প্রতিবাদে ও কল্পনার সন্ধান চেয়ে পাহাড়ী গণ পরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের আহ্বানে বাঘাইছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা নৌ ও সড়ক পথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। অবরোধ পালনকালে রুপম চাকমা (১৬) ভিডিপি’র গুলিতে শহীদ হন। অন্যদিকে মনতোষ চাকমা (২০), সমর বিজয় চাকমা (১৮) ও সুকেশ চাকমা (১৬) সেটেলার বাঙালি কর্তৃক গুমের শিকার হন। তাঁদের লাশ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

Back to top button