সরকার ও আদিবাসী জনগণের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি—যেমন ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নিঃ OHCHR এ ড. বিনোতা ময় ধামাই

আইপিনিউজ বিডি, ১৭ জুলাই, আন্তর্জাতিক ডেক্সঃ ‘সরকার ও আদিবাসী জনগণের মধ্যে সম্পাদিত শান্তিচুক্তিগুলো, যেমন ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, এখনো বাস্তবায়ন হয়নি’—এমন মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রক্রিয়া (EMRIP)-এর সাবেক বিশেষজ্ঞ ড. বিনোতা ময় ধামাই। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পালে দে নাসিওঁ (Palais des Nations)-এ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার আদিবাসী জনগণের এশিয়া সমাজ-সাংস্কৃতিক অঞ্চলের পক্ষে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। ১৩ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত EMRIP-এর ১৯তম অধিবেশনের অংশ হিসেবে গ্লোবাল ইন্ডিজেনাস ককাস (Global Indigenous Caucus) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের মধ্যে এ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিনোতা ময় ধামাইয়ের নেতৃত্বে গ্লোবাল ইন্ডিজেনাস ককাসের প্রতিনিধিদল হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
বক্তব্যে তিনি বলেন, এশিয়ার আদিবাসী জনগণের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো একাধিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাব। এর মধ্যে রয়েছে সামরিকীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণমূলক আহরণ (এক্সট্র্যাকটিভিজম), জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নামে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, নাগরিক পরিসরের সংকোচন এবং ডিজিটাল রূপান্তর। এসব সংকট সম্মিলিতভাবে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত শাসনব্যবস্থা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (Right to Self-determination) চর্চাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আদিবাসীরা এখনো সামরিকীকরণ, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, চলাচলের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, নজরদারি বৃদ্ধি এবং আদিবাসী নেতা ও অধিকারকর্মীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এসব চাপ আদিবাসীদের প্রথাগত ও রীতিনির্ভর শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করছে এবং বিশেষ করে আদিবাসী নারী, কন্যাশিশু ও মানবাধিকার রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, আদিবাসী মানবাধিকার রক্ষাকারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, কৌশলগত মামলার (Strategic Litigation) অপব্যবহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ এবং ডিজিটাল নজরদারির শিকার হচ্ছেন। আদিবাসীদের ভূমি, অঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার কারণে পরিবেশ রক্ষাকারী অধিকারকর্মীরা বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানবাধিকার রক্ষাকারীদের মধ্যে অন্যতম।
এশিয়া সমাজ-সাংস্কৃতিক অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের পক্ষে ড. বিনোতা ময় ধামাই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR)-কে আদিবাসী মানবাধিকার রক্ষাকারীদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি নাগরিক পরিসর সুরক্ষিত রাখা, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ প্রতিরোধ এবং আদিবাসী নেতা, প্রবীণ ও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও আহ্বান জানান, জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এশিয়ার আদিবাসী জনগণের আরও বিস্তৃত ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এ অঞ্চলের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।
ড. ধামাই বলেন, এশিয়ার আদিবাসী জনগণ এখনো রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংঘাতের প্রভাব বহন করছে। সরকার ও আদিবাসী জনগণের মধ্যে সম্পাদিত শান্তিচুক্তিগুলো প্রায়ই বাস্তবায়িত হয় না। এর একটি উদাহরণ হলো বাংলাদেশের ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, যা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, আদিবাসী জনগণের স্বীকৃতি, তাদের ভূখণ্ডগত স্বায়ত্তশাসন এবং অভ্যন্তরীণ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব অধিকার যথাযথ আইনগত ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষিত করা উচিত। তিনি OHCHR-কে এশিয়ার সরকারগুলোকে আদিবাসী জনগণের অধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।
সবশেষে তিনি এশিয়ায় OHCHR-এর মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি আরও জোরদারের আহ্বান জানান। তিনি এ লক্ষ্যে অধিক সম্পদ বরাদ্দ, আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক নিবেদিত ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ এবং আদিবাসী পেশাজীবীদের নিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।


