জাতীয়

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করলে জুম্ম জনগন তা মেনে নেবে নাঃ ঊষাতন তালুকদার

আইপিনিউজ, ২০ মে, রাঙ্গামাটিঃ আজ ২০ মে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ৩৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কুমার সুমিত রায় জিমনেশিয়াম প্রাঙ্গনে এক ছাত্র ও জন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ছাত্র ও জন সমাবেশে ঊদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির সহ সভাপতি ঊষাতন তালুকদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলে বাংলাদেশের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিশির কান্তি চাকমা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মাহির শাহরিয়া রেজা এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উলি সিং মারমা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি জিকো চাকমা।
ঊষাতন তালুকদার বলেন, ১৯৪৭ সালে রেডক্লিফ মিশন অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করে ঐতিহাসিক ভুল করে। এই ভুলের মাশুল পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণকে এখনও দিতে হচ্ছে। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাদেরকে বাঙালি হতে বলেছেন। তারপর আশির দশকে জিয়াউর রহমান পার্বত্য অঞ্চলে সেটেলার বাঙালি পুনর্বাসন করে এ অঞ্চলের জনমিতি পরিবর্তন ও জুম্মদের সংখ্যালঘুকরণ নীতি শুরু করে। সকল শাসকের নীতি জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্ব ধ্বংস ও নির্মূলের জন্য গৃহীত হয়। কিন্তু অধিকার সচেতন জুম্ম জনগণ বরাবরই শাসকগোষ্ঠীর এসব নীতির বিরোধিতা করে এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামে কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ জুম্মরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। জনসংহতি সমিতিকে জনগণ আপন করে নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সহযোগিতা দিয়ে পাশে থেকেছেন এবং এখনও নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে জুম্ম জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিই আমাদের বর্তমান সময়েও অন্যতম দাবিদার।

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের মানুষ এখনও সরকারের প্রতি বিশ্বাস রেখে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করে যাচ্ছে। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে, আমরা আর অযথা সময় ব্যয় করতে পারিনা। পাহাড়ের মানুষ সংখ্যায় কম হতে পারে, কিন্তু শক্তিতে তাদেরকে কম ভাবা ভুল হবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে কোন ছাড় দেওয়া হবেনা। আমাদের এখানে রাষ্টীয় ক্ষমতায় যারা বসে তথা শাসকগোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট একটি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে চলে। তারা আপনার-আমার, কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের কথা ভাবে না। বাংলাদেশের আপামর জনমানুষের এখন এজন্যই এতো দুর্দশা। জুম্মদের জাতীয় মুক্তির দীর্ঘস্থায়ী লড়াই-সংগ্রামে নীতির প্রশ্নে কারোর সাথে কোন আপোষ নয় এবং দ্রুত নিষ্পত্তির কৌশলে আমাদের আন্দোলন করে যেতে। ৬০-৭০ দশকের সেসময়কার একতা ফিরিয়ে আনতে হবে, ঐক্য ছাড়া বিকল্প নাই।

নাজমুল হক প্রধান বলেন, একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল শান্তিপূর্ণ জনপদ। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশেষ করে সেখানে সেটেলার বাঙালিদের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে অশান্তির সূচনা হয়। বর্তমানে সেই সেটেলার গোষ্ঠীর একটি অংশ পাহাড়কে অস্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্তমান প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা হলো ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন। তাই পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারকে দ্রুত চুক্তির সকল ধারা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

শিশির চাকমা বলেন, পিসিপি দীর্ঘ ৩৭ বছরের সংগ্রামে পাহাড়ী জুম্ম সমাজের মধ্যে আস্থার সঞ্চয় করেছে। পিসিপির ছাত্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে দীর্ঘ সংগ্রামে ত্যাগ-তিতিক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে। আগামীর দিনেও পিসিপিকেই জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে। উন্নয়নের ফুলঝুড়ি আমাদের শান্তির জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে জিইয়ে রেখেছে। আমরা বারুদের উপর বসে আসি। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। সংগ্রাম ব্যতীত আমাদের বিকল্প কোনো পথ নেই। ঐক্যবদ্ধ থেকে পিসিপিকে কাজ করে যেতে হবে।
মুক্তা বাড়ৈ বলেন, পিসিপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একদিকে যেমন সবার মুখে আনন্দের ছাপ দেখা যাচ্ছে, তেমনি উপস্থিত সবার চোখেমুখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও স্পষ্ট। পিসিপি যেমন পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি ১৯৯৭ সালে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। সংবিধানে কখনো তাদের “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী”, আবার কখনো “উপজাতি” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পেছনে একটি উগ্র গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে তিন পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ থাকলেও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার অভাবে তা আজও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বিভিন্ন নীতির কারণে তিন পার্বত্য জেলায় আদিবাসীরা নিজেদের ভূমিতেই ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরি বলে তিনি দাবি জানান।

মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, বিভিন্ন সরকার পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংকটে ঠেলে দিয়েছে। স্বৈরাচারী পতিত সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করলেও তাদের বিন্দুমাত্র প্রতিশ্রুতির সততা রক্ষা করেনি। বরং পাহাড়ী মানুষের আত্মপরিচয় মুছে দিয়ে উপজাতি বানানোর পায়তারা চালিয়েছে। সংবিধানে সকল জাতির আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী নির্বাচিত সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন বাঙালী প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে চুক্তির লঙ্ঘন করেছে। নির্বাচিত সরকার ও চুক্তি বাস্তবায়ন করবেন কিনা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন পিসিপির জন্মলগ্ন থেকে লড়াই-সংগ্রামে পাশে ছিলো। উভয় সংগঠনের লড়াইয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ছিলো। আগামীতে পাহাড় ও সমতলে শোষিত মানুষের লড়াইয়ে আমরা একসাথে লড়বো।

উলিসিং মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রাষ্ট্রীয় নীতি ও ব্যবস্থার কারণে আজ হুমকির মুখে রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বরং উন্নয়নের নামে পার্বত্য অঞ্চলে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, কিন্তু জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও ভূমির প্রশ্নে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নারীদের আরও গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে নারীদের অংশগ্রহণ জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে।

স্বাগত বক্তব্যে জিকো চাকমা বলেন, অনেক আত্মত্যাগী কর্মীর আত্মবলিদানে পাহাড়ের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে তাদের রক্ত ও সংগ্রামের পথ ধরে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ক্রমশ অধিকতর শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ ছাত্র সমাজ ঐতিহাসিকাল থেকে যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ে শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সংঘটিত অন্যায়েও পাহাড়ের ছাত্র সমাজ কখনো চুপ করে থাকেনি। চুক্তি সাক্ষরের ২৮ বৎসর পরে এসেও জুম্ম জনগণের অধিকার পদে পদে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। জাতির ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আগামী দিনের লড়াই সংগ্রামে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর আন্দোলনে সামিল হতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সমাবেশটির সমাপ্তি ঘটে। সভাপতির বক্তব্যে রুমেন চাকমা পিসিপি’র নিম্নোক্ত দাবি তুলে ধরেন-
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্ম পরিকল্পনা ঘোষণা কর।
২. জুম্ম নারীর ওপর সহিংসতার বিচার দ্রুত নিশ্চিতকরণে ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন কর।
৩. জুম্ম অধ্যুষিত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পর্যাপ্ত শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণসহ শিক্ষক সংকট নিরসন কর।
৪. দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুম্ম জনগণের প্রধান ও বৃহত্তম সামাজিক উপলক্ষে উৎসব পাঁচ দিনের ছুটি চালু কর।
৫. উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ভর্তির ক্ষেত্রে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে আদিবাসীদের জন্য ৫% কোটা চালু কর।

Back to top button