মতামত ও বিশ্লেষণ

পাহাড়ের ছাত্র ও যুব সমাজের আশা ও আন্দোলনের প্রতীক: পিসিপি’র ৩৭ বছর

ম্যাকলিন চাকমা

পাহাড়ের ছাত্র ও যুব সমাজের আশা ও আন্দোলনের প্রতীক: পিসিপি’র ৩৭ বছর

আগামী ২০শে মে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) তার সংগ্রামী পথচলার ৩৭তম বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার ও জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনের ইতিহাসে পিসিপি এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। এই সংগঠনের পতাকাতলে প্রায় আট বছর কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে— যা কেবল একটি সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নয়, বরং পাহাড়ের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগকে কাছ থেকে দেখার এক রাজনৈতিক শিক্ষার পথ। পিসিপির গৌরবময় সংগ্রামের ৩৭ বছরের এই প্রান্তে দাঁড়িয়ে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেইসব শহীদ ও সংগ্রামী সহযোদ্ধাদের, যাঁরা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত পথ ধরেই আজও পাহাড়ের ছাত্র-যুব সমাজ ন্যায়, মর্যাদা ও মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। এই সংগ্রাম কেবল ভৌগোলিক অস্তিত্ব রক্ষার নয়; এটি আত্মপরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম। যুগের পর যুগ জুম্ম জনগণ রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা, ভূমি দখল ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। পাহাড়ের মানুষের এই দীর্ঘ জাতীয় আন্দোলনে ছাত্র-যুব সমাজ সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আর সেই সংগ্রামী ধারার অন্যতম সংগঠিত শক্তি হলো পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)।

১৯৮৯ সালের ২০শে মে প্রতিষ্ঠিত হয় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। লংগদুর গণহত্যার প্রতিবাদ এবং পাহাড়ে চলমান রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার ঐতিহাসিক প্রয়োজন থেকেই পিসিপির জন্ম হয়। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা ও সামরিক দমনের এক উত্তাল ভূখণ্ড। জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব, ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর ক্রমাগত আঘাত নেমে আসছিল। এই বাস্তবতায় পাহাড়ের ছাত্র-যুব সমাজ উপলব্ধি করেছিল— সংগঠিত ছাত্র আন্দোলন ছাড়া জাতির মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় পিসিপি। সূচনালগ্ন থেকেই সংগঠনটি জুম্ম জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং পাহাড়ের মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে আসছে।

পিসিপি কেবল একটি ছাত্র সংগঠন নয়; এটি পাহাড়ের নিপীড়িত মানুষের রাজনৈতিক চেতনার বারুদ । এই সংগঠনের মধ্য দিয়ে অসংখ্য ছাত্র-তরুণ সংগ্রামের ইতিহাস জেনেছে, জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা অর্জন করেছে এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছে। জুম্ম জাতীয় জীবনে পিসিপির অবদান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি ছাত্রসমাজের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। অনেকে পরবর্তীতে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক সংগঠন, সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনগণের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের পথ কখনো মসৃণ ছিল না। এটি ছিল রক্তপিচ্ছিল পথ। পাহাড়ের অসংখ্য ছাত্র-যুবক আত্মদান করেছে, কারাবরণ করেছে, গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু দমন-পীড়ন আন্দোলনের স্পৃহাকে থামাতে পারেনি। কারণ জুম্ম জনগণের জন্য এই সংগ্রাম ছিল অস্তিত্বের সংগ্রাম। পিসিপির অসংখ্য নেতাকর্মী বুকের রক্ত দিয়ে পাহাড়ের আন্দোলনের ইতিহাস লিখেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ আজও নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামের সাহস জোগায়।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ সবসময় প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান বারবার প্রগতিশীল আন্দোলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভাজন, ষড়যন্ত্র ও দমননীতির মাধ্যমে জুম্মদের ঐক্য নষ্ট করার বহু অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু পিসিপি ধারাবাহিকভাবে জনগণের ঐক্য, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির পক্ষে কথা বলেছে।

সংগঠনটি বিশ্বাস করে— জনগণের মুক্তি কেবল গণমানুষের শক্তির মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে।
পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকারের প্রশ্নে পিসিপির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার, পাহাড়ে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ভূমি বেদখল প্রতিরোধ এবং সামরিক হয়রানির বিরুদ্ধে পিসিপির আন্দোলন পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় চেতনা, রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে সংগঠনটির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

পিসিপি বারবার উচ্চারণ করেছে— পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের স্থায়ী সমাধান সামরিকীকরণ বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর সমাধান নিহিত রয়েছে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বীকৃতির মধ্যে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার মানে বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং নিজের ভূমি, সংস্কৃতি, ভাষা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার। এই অধিকারের দাবিতে পিসিপি বরাবরই পাহাড়ের ছাত্র-যুব সমাজের কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পরও পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভূমি দখল, সামরিকীকরণ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সাম্প্রদায়িক হামলার নানা ঘটনা আজও পাহাড়ের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই বাস্তবতায় পিসিপি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমি কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এবং পাহাড়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটি মনে করে, জনগণের ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশা পূরণ ছাড়া শান্তির কোনো বাস্তব ভিত্তি তৈরি হতে পারে না।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে যখন ভোগবাদী সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন পিসিপি পাহাড়ের তরুণদের সমাজ, জাতি ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়ার শিক্ষা দেয়। পিসিপি ছাত্র-যুব সমাজকে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য নয়, সাংস্কৃতিক জাগরণ, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল চেতনা নির্মাণের জন্যও উদ্বুদ্ধ করে। পাহাড়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পিসিপির ভূমিকা আজও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

৩৭ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় পিসিপি বহু সংকট, দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু সংগঠনটি তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। কারণ পিসিপির শক্তি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে পাহাড়ের সাধারণ ছাত্র-যুব, শ্রমজীবী মানুষ ও নিপীড়িত জনগণের ভালোবাসা এবং আস্থার মধ্যে।
আজ যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে, তখন পিসিপির দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। জুম্ম জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে আরও সুসংগঠিত করতে নতুন প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রক্তপিচ্ছিল পথ বেয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও গণমুখী করে তোলাই আজকের সময়ের দাবি।
পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ৩৭ বছর তাই কেবল একটি সংগঠনের বয়স নয়; এটি পাহাড়ের জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজের স্বপ্ন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আশার ইতিহাস। এই ইতিহাস এখনও লেখা হচ্ছে পাহাড়ের প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি শ্লোগানে। লড়াই চলবেই, যতদিন না পাহাড়ের মানুষ তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়।

লেখক:
ম্যাকলিন চাকমা
*সাবেক কেন্দ্রীয় তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, পিসিপি।

Back to top button