আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কল্পনা চাকমার অপহরণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ

আইপিনিউজ বিডি, ১৩ জুন, ডেক্স রিপোর্টঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংগ্রামী নারী নেত্রী কল্পনা চাকমার অপহরণের ৩০ বছর উপলক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অপহরণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার লাইল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হন তিনি। কল্পনাকে সেই রাতে শৃঙ্খলা বাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদধারী একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে পরিবার থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তার অপহরণের ঘটনায় দেশে ও বিদেশে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। দেশের ভেতর ব্যাপক বিক্ষোভ ও পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। কল্পনা চাকমা আজও নিখোঁজ, এখনো গুম! কল্পনা চাকমার অপহরণের পর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উদ্যোগে ঢাকা থেকে আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, পাহাড়ী গণ পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সমন্বয়ে একটি দল অনুসন্ধানের পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১১ সালে প্রকাশিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন সম্পাদিত ‘কল্পনা চাকমার ডায়েরি’ গ্রন্থে এটা সংকলিত আছে।]
গত ১২ তারিখ ১:৩০ টার সময় রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি থানার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রাম থেকে একদল (৭/৮ জন) সশস্ত্র সাদা পোশাকধারী লোক হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেত্রী (সাংগঠনিক সেক্রেটারী) কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে আমরা অবহিত হই খবরের কাগজের মারফত। অপহরণের কয়েকদিন পর পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং পাহাড়ী গণ পরিষদ প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়। কল্পনা চাকমাকে অপহরণকালে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তার দুই ভাইকেও চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কোন রকমে তারা পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। গত ২৬/৬/৯৬ তারিখে বিকাল ৩:৩০টার সময় দুই ভাইসহ হিল উইমেন্স ফেডারেশন কল্পনা চাকমার মুক্তির দাবিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে তাদের দাবি ছিল:
১. কল্পনা চাকমাকে অবিলম্বে উদ্ধার করা
২. অপহরণের ঘটনাবলী সরেজমিনে তদন্তের জন্য একটি বিচারবিভাগীয় কমিটি গঠন
৩. অপহরণের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা
৪. অপহৃত কল্পনা চাকমাকে যে কোন শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের জন্য যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান
৫. ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা
গত ২৭.৬.৯৬ তারিখে এই তিনটি সংগঠন বাঘাইছড়িতে অবরোধ কর্মসূচী পালন করে। এই অবরোধ কর্মসূচী পালনকালে রূপন চাকমা (১৬) নামে একজন স্কুল ছাত্র নিহত হয়। তার লাশের কোন হদিস এখনও পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে বাঘাইছড়ি থানায় একটি FIR করা হয়। ওইদিন সকাল বেলা অবরোধ কর্মসূচি সফল করার জন্য মনোতোষ চাকমা (পিতা বাঘা চাকমা), সুকেশ চাকমা (এস.এস.সি পরীক্ষার্থী; বাবা পুর্নেন্দুলাল চাকমা) এবং সমর বিজয় চাকমা (এস.এস.সি পরীক্ষার্থী; বাবা প্রতিকুমার চাকমা) বাঘাইছড়ি শহর এলাকায় রওয়ানা দেওয়ার পর সম্পূর্ণভাবে নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের আর কোন খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার বিবরণ
২ জুলাই ১৯৯৬ ঢাকা থেকে আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, পাহাড়ী গণ পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি দল কল্পনা চাকমা অপহরণ সংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধানে রাঙামাটি শহর এবং বাঘাইছড়ি থানায় যায়।
১. প্রথম সাক্ষাৎকার: বিজয় কেতন চাকমা (তারিখ : ২.৭.৯৬; সময় : বিকাল ৩:৩০টা থেকে ৪:৪৫টা)
বিজয় কেতন চাকমা পাহাড়ী গণ পরিষদের একজন অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য। উনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের একজন সদস্য সঞ্চয় চাকমা টেলিফোনে বিজয় কেতন চাকমাকে কল্পনা চাকমার অপহরণের খবর জানান। বিজয় কেতন চাকমার সাথে কল্পনা চাকমার শেষ দেখা হয় ৭ জুন ১৯৯৬ বাঘাইছড়ি এলাকার মেদিনীপুরে। বিজয় কেতন চাকমা আরও জানান যে, অপহরণের কারণে ১২ জুন ১৯৯৬ দিন বেলা ১২টা পর্যন্ত বাঘাইছড়ি থানার কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোট প্রদান বন্ধ ছিল। উনি ওই দিন (১২ জুন) জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করেন। পুলিশ সুপারকে কল্পনা চাকমার অপহরণের বিষয়টি জানালে উনি বলেন যে, “অস্ত্র কার কাছে থাকে, সেনাবাহিনী না শান্তিবাহিনীর কাছে?”
১৫ জুন ১৯৯৬ দুপুর ২টায় বিজয় কেতন চাকমা বাঘাইছড়িতে যেয়ে থানা নির্বাহী অফিসারের সাতে দেখা করে জানতে পারেন যে, এ.ডি.সি. পুলিশ সুপার এবং ওসি কল্পনা চাকমার বাড়ীতে যায় এবং পরবর্তীতে কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দিকুমার চাকমার (৩০) কাছ থেকে বক্তব্য (statement) লিপিবদ্ধ করে। পরে বাঘাইছড়ি থানায় একটি FIR করা হয়। নম্বর ২/৯৬ (১২.৬.৯৬)। বিজয় কেতন চাকমা আরও জানান যে, এজাহারে কে বা কাহারা নিয়েছে—সে বিষয় উল্লেখ নেই। বক্তব্য পড়ে শোনান হয় নাই কিন্তু statement এর উপর দস্তখত নেয়া হয়। উনি আমাদেরকে আরও জানান যে, মার্চ মাসে কল্পনাদের এলাকায় কিছু বাড়িঘর সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুড়িয়ে দেয়। লে: ফেরদৌস ওই এলাকার terror এবং অনেককে ধরে নিয়ে গিয়ে পিটিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে অনেক পাহাড়ী ব্যক্তিকে detention এ নিয়ে গিয়েছিল। writ করে দাঁড়ান হয়েছে। বিজয় কেতন চাকমাকে ১৯৯১ সালে detention এ নিয়ে গিয়েছিল। writ petition করার মাধমে উনি মুক্তি লাভ করেন।
কল্পনাকে অপহরণ করার কারণ জানতে চাইলে উনি বলেন চাকমাদের ভয় দেখানোর জন্য এটা করা হয়েছে। আর তাছাড়া কল্পনা চাকমা নারীদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। ওর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করারও ক্ষমতা ছিল। ১৮ জুন ১৯৯৬ সিজক মুখ হাই স্কুলের হেড মাষ্টার জ্ঞানবিকাশ চাকমা দেখতে পান যে, দুটো স্পিডবোট দুটো মেয়েকে নিয়ে বিকেল ৫:০০ টার দিকে বাঘাইছড়ি থেকে কজইছড়িতে (কল্পনাদের বাড়ির কাছের সেনা ক্যাম্প) যায় এবং ওখান থেকে ফেরার সময় উনি খেয়াল করেন এবং দেখেন যে, তিনটি মেয়ে একটি বোটে বাঘাইছড়িতে ফিরে যায়। উনি মনে করেন যে, ওই তৃতীয় মেয়েটি কল্পনা চাকমা। পরে এই ঘটনাটি উনি বিজয় কেতন চাকমাকে জানান। ২৭ তারিখে অবরোধ কর্মসূচী পালনের পরের দিন অর্থাৎ ২৮ জুন DGFI এর ডিরেক্টর মেজর লুৎফর বিজয় কেতন চাকমার সাথে দেখা করতে এসে বলেন, অবরোধকারীরা উনার গাড়ি ভেঙেছে। এবং পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দীপ্তিমান চাকমা জানান, শোনা যাচ্ছে ওই এলাকা থেকে দুজন বাঙালি ও নিখোঁজ হয়েছে।
২. সাক্ষাৎকার : জেলা প্রশাসক, শাহ আলম (তারিখ : ২.৭.৯৬; সময় : ৫টা-৬:৩০টা)
রাঙ্গামাটি জেলার জেলা প্রশাসকের কাছে কল্পনা চাকমা অপহরণ সংক্রান্ত FIR এর একটি কপি আছে। পুরো FIR টি উনি তদন্ত দলটিকে পড়ে শোনান। FIR টিতে সুনির্দিষ্ট সময়, কতজন ব্যক্তি, সশস্ত্র কি না ইত্যাদি বিষয়গুলোর কোন উল্লেখ নেই। লেখা আছে আনুমানিক সময়, আনুমানিক ১০/১২ জন ইত্যাদি তথ্যগুলো। অর্থাৎ FIR টি অস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তদন্ত দল জেলা প্রশাসকের কাছে জানতে চায় যে, কল্পনা চাকমাকে কি উদ্ধার করা যাবে? উনি বলেন, “Law will take it’s own course”। পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্তের ফলাফল অচিরেই জানা যাবে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসককে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, কল্পনা চাকমার উদ্ধারের ব্যাপারে স্থানীয় সরকার এবং প্রশাসন কতদূর এগিয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন যে, একটি বিশ্বাসযোগ্য এজেন্সী জানিয়েছে কল্পনা চাকমা নাকি এখন রাঙামাটিতে। পুলিশের তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে ইনকোয়ারি অফিসার শহীদুল্লাহকে। পুলিশ সুপার তদন্তের কাজটি সার্বিক ভাবে দেখাশোনা করছেন।
৩. সাক্ষাৎকার : পুলিশ সুপারেনটেনডেন্ট, মোঃ নুরুল আনোয়ার (তারিখ : ২.৭.৯৬; সময়: বিকেল ৭টা-৮টা পর্যন্ত)
পুলিশ সুপার বলেন, কল্পনা চাকমার বড় ভাইয়ের জবানবন্দী নেন থানার নির্বাহী অফিসার সকাল ১১:৩০ টার সময়। তদন্ত দল জানতে চাইল ছোট ভাইয়ের কাছে সঠিক সম্পূর্ণ তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন বড় ভাইয়ের জবানবন্দী FIR করা হলো? পুলিশ সুপার উত্তর জানালেন যে, অভিযোগকারী যে হতে চেয়েছে, তারই জবানবন্দী নেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, দুই ভাইয়ের মধ্যে সকালে দেখা হয়, তাতে ওরা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মামলাটি আরও গুছিয়ে ফেলতে পারত, কিন্তু তারা সেটা কেন করে নাই, পুলিশ সুপার বুঝতে অপারগ। কল্পনা চাকমার উদ্ধার কাজ কতদূর এগিয়েছে জানতে চাইলে জানান, তদন্তের স্বার্থে কিছু বলা যাবে না। সঠিক তথ্য পেলে আগামীকালও সম্ভব হবে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করে ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে উপস্থিত করলে মামলার অগ্রগতি হবে।
উনি আমাদের জানান যে, সারা রাঙ্গামাটি এলাকায় ১৮০ টি সেনা ক্যাম্প আছে। কজইছড়ি ক্যাম্পের অফিসার লে: ফেরদৌসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং আরও অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রূপন চাকমার হত্যাকান্ডের ব্যাপারে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের তিনজন নেতা FIR করেছেন। আমাদের আরও প্রশ্ন ছিল যে, উদ্ধার কাজে সেনাবাহিনী উনাদের কতটুকু সাহায্য করেছে? উনি বলেন, সর্বাত্মক সাহায্য উনারা সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পাচ্ছেন। সেনা জিওসি এবং ব্রিগেড কমান্ডার পুলিশ সুপারকে বলেছেন যে, সেনা ক্যাম্পে পুলিশ কর্মকর্তারা যেয়ে তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। সর্বশেষে উনি আমাদের বলেন যে, সঠিক তথ্য পেলে উনি ১০০% নিশ্চিত করতে পারেন কল্পনা চাকমার উদ্ধার কার্য।
লে: ফেরদৌসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তের স্বার্থে করা হয়েছে। কল্পনা জীবিত আছে না তাকে হত্যা করা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি তদন্ত দলকে কিছুই বলতে পারেননি।
৪. মেজর এফ মাহবুবুর রহমান, রাঙ্গামাটি, ব্রিগেড কমান্ড অফিস (তারিখ : ২ জুলাই ১৯৯৬; সময় : ৯:০০-৯:৪৫ )
আমরা ব্রিগেড কমান্ডারের সাথে দেখা করতে চাইলে আমাদের সাথে উনি সাক্ষাৎকার দেননি, তবে সেকেন্ড ইন কমান্ডে যিনি, আমাদের সাথে কথা বলেছেন। আমাদের সাথে হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এবং পাহাড়ী গণপরিষদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। কথা শুরু হওয়ার প্রারম্ভেই উনি আমাদের জানিয়েছেন যে, “আপনারা যে ব্যাপারে এখানে এসেছেন, সে ব্যাপারে আমি আপনাদের কোন সহযোগিতা করতে পারব না।” উনি একটি বারের জন্য কল্পনা চাকমার নাম অথবা তার অপহরণের কথাটি আমাদের সামনে উচ্চারণ করেননি। উনি আমাদেরকে তথ্য দিতে পারতেন যদি আমরা আগে ISPR এর সাথে যোগাযোগ করে তারপর উনার সাথে দেখা করতে যেতাম। উনি আমাদেরকে বলেন যে, কল্পনা চাকমা আওয়ামী লীগের সংসদ নির্বাচন প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের জন্য নির্বাচন প্রচার চালাচ্ছিল, সে কারণে আওয়ামী লীগ বিরোধী লোকজন তাকে অপহরণ করেছে। উনি আরও বলেন যে, চাকমারা টাকা পয়সার জন্য (এই বছর সেনাবাহিনী ১০ লক্ষ টাকা চাকমাদের মধ্যে বিতরণ করেছে) আমাদের কাছে আসে, কিন্তু কোন সমস্যা হলে পুলিশের কাছে চলে যায়।
৫. ঘটনার স্থান : কল্পনা চাকমার বাড়ী, গ্রাম-নিউ লাল্যাঘোনা, থানা-বাঘাইছড়ি (তারিখ: ৩.৭.৯৬; সময় : ৪-৫:৩০টা পর্যন্ত)
কল্পনা চাকমাদের বাড়ির সদস্য ৫ জন। দুই ভাই। বড় ভাইয়ের স্ত্রী, মা এবং কল্পনাসহ ৫ জন। কল্পনার বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। কল্পনার মায়ের নাম : বাঁধুনী চাকমা। কল্পনার বড় ভাই এর নাম কালিন্দিকুমার চাকমা। কল্পনার ছোট ভাইয়ের নাম কালিচরণ / ক্ষুদিরাম চাকমা। উনাদের সবার সাথে আলাপ করে জানা গেছে যে, ১১ তারিখ রাত ১:৩০ টার সময় অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র ৭ ঘন্টা আগে ৭/৮ জন সশস্ত্র সাদাপোশাকধারী (দুই জনের পরনে লুঙ্গি ছিল) লোক এসে দরজা কেটে উনাদের ঘরে ঢুকে পড়ে। কল্পনা চাকমার মা তখন আধ ঘুম অবস্থায় ছিলেন। উনি জেগে উঠার পর অন্যরাও জেগে যায় ওদের চিৎকারে। ওরা বাংলায় চিৎকার করে জানতে চায় “কে আছে ঘরে? বাড়িতে কে কে আছ বেড়িয়ে আস”। ওরা সবার চোখে টর্চের আলো মারে। ক্ষুদিরাম ওই সময় হাত দিয়ে আলো আটকাতে গিয়ে আলোর প্রতিফলনে লে: ফেরদৌস এবং দুজন ভিলেজ ডিফেন্স পার্টির (VDP) সদস্যকে চিনে ফেলে। তাদের নাম নুরুল হক এবং সালাহ। প্রথমে ক্ষুদিরামকে দুজন চোখ বেধে বাড়ির পশ্চিমে কুয়ার ধারে নিয়ে যায়। ক্ষুদিরাম চোখ বাধা অবস্থায় আন্দাজে বুঝতে পারে যে ওটা কুয়োর ধার। এর মাঝখানে কল্পনার মা জানালেন যে, সেনাবাহিনীর আরও সদস্যরা (৭/৮ জন বাদে) সারা বাড়ী ঘিরে রেখেছিল। ক্ষুদিরামকে পরে ওরা বিলের ধারে নিয়ে বিলের পানিতে নামতে বলে। পানিতে নামার পর পরই গুলি করার নির্দেশ দিলে ক্ষুদিরাম প্রাণ ভয়ে পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে এবং সাঁতরাতে সাঁতরাতে বিবস্ত্র অবস্থায় পাশ্ববর্তী লাম্বার বাড়িতে যেয়ে উঠে। সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি করে কিন্তু সে অক্ষত অবস্থায় পালাতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে সশস্ত্র ব্যক্তিরা কল্পনা চাকমা এবং বড় ভাই কালিন্দিকুমার চাকমাকে চোখ বেধে নিয়ে আসে। গুলির আওয়াজে সে ভয় পেয়ে নিজেকে ওদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পালাতে পালাতে আরও দুটি গুলির আওয়াজ শোনে এবং কল্পনা চাকমার চিৎকার শুনতে পায় কল্পনা চাকমার পরিবারের সদস্যরা। এখনও জানেনা কল্পনাকে হত্যা করা হয়েছে নাকি জীবিত আছে।
এই ঘটনা ঘটার আগে গত ১৯ মার্চ ১৯৯৬ নিউ লাল্যাঘোনার ৭টি বাড়ী পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা এ কাজ করে। যাদের বাড়ি পোড়ান হয় তারা হচ্ছেন, কৃপামোহন কারবারী, রাঙ্গমোহা চাকমা, দাদিরাম চাকমা, ভাটারাম চাকমা, ননী গোপাল চাকমা, কাশ্মীর চাকমা এবং অজয়কুমার। এর পর বিজু উৎসবের কিছুদিন আগে (এপ্রিল মাস) লে: ফেরদৌস এবং আরও ১৫/২০ জন সেনা সদস্য কল্পনাদের বাড়ি এসেছিল। তারা এসেছিল দুপুরবেলা। লে: ফেরদৌস কল্পনাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের ভুল স্বীকার করে। কল্পনা চাকমার সাথে লে: ফেরদৌসের বাড়ী পোড়ানোর ঘটনা নিয়ে অনেক বাক বিতন্ডা হয়। বাড়ী পুড়িয়ে দেওয়ার পর গ্রামবাসীরা অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়।
১৯৯৩/৯৪ সালে ৪৬ বেঙ্গলের সেনাসদস্য সুবেদার মো: শাহজাহান কৃপামোহন চাকমার পুত্রবধু এবং মেয়েকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। তাছাড়া ৪৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা এলাকার যুবতী মেয়েদের নাম সংগ্রহ করে। এই ধর্ষণ সংক্রান্ত বিষয়টি একটি অভিযোগ আকারে জোনাল কমান্ডারকে (৪৬ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ম্যারিশ্যা জোন) জানান হয়। বিষয় ছিল পাহাড়ি নারী ধর্ষণ সম্পর্কে। বিবাদীর নাম সুবেদার মো: শাহজাহান, গ্রাম-নিউ লাল্যাঘোনা, থানা-বাঘাইছড়ি ও সুনীতা চাকমা পিতা-মৃত চিক্কুয়া চাকমা, গ্রাম-নিউ লাল্যাঘোনা। বিজু উৎসবের আগে এপ্রিল মাসে লে: ফেরদৌস এবং তার সেনা সঙ্গীরা যখন কল্পনা চাকমাদের বাসায় আসে তখন লে: ফেরদৌস কল্পনাকে বলে, “শান্তিবাহিনী এবং অন্যান্য সংগঠন মিলে যে আন্দোলন করছে সেটা কি কোন দিন সফল হবে?”
বোধিসত্ব চাকমা, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ওই সময় ওখানে উপস্থিত ছিল। বোধিসত্ত্ব লে: ফেরদৌসকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “আপনারা ঘরবাড়ি পুড়িয়েছেন কেন? এবং লোকজনকে কেন মেরেছেন?” লে: ফেরদৌস উত্তর দেয়, “আমরা না বাঙালিরা করেছে”।
ক্ষুদিরামের সাথে বড় ভাই কালিন্দিকুমার চাকমার দেখা হয় ১২ জুন ১৯৯৬ সকাল ৭টার সময়। বিলের মধ্যে ওই দিন ammunition pouch পাওয়া যায়। এলাকাবাসীরা জানায় এগুলো VDP সদস্যরা ব্যবহার করে। তারপর ১২ জুন ১৯৯৬ সকাল ৭টায় সারা এলাকায় কল্পনা চাকমার অপহরণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রামবাসীরা ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়। গ্রামবাসীরা বড় ভাইকে নিয়ে থানা নির্বাহী অফিসারের (TNO) কাছে যায়। সাথে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দীপ্তিমান চাকমা ছিলেন। TNO হাসান জাহাঙ্গীর আলম বড় ভাইয়ের জবানবন্দী নেন। সেটা TNO নিজেই লিখেছিলেন। ওদিকে ক্ষুদিরামকে নিয়ে কজইছড়ি সেনা ক্যাম্পে যায় সাম্রাজ্য চাকমা, প্রাক্তন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। বড় ভাই পরবর্তীতে থানায় গেলে থানায় একটি FIR করা হয়। গ্রামবাসীরা জানায় লে: ফেরদৌস এখনও দায়িত্বে আছে, তবে তাকে দেখা যাচ্ছে না।
১ জুলাই ১৯৯৬ এস.পি, ও.সি. এসেছিল। ঘটনা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ঘটনার ১৪ দিন পর উগলছড়ি জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ২৬ জুন ১৯৯৬ বাজারে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে সুবেদার মোজাম্মেল হকের সাথে কথা হয়। কুশল বিনিময়ের পর কজইছড়ি সেনা ক্যাম্পের সুবেদার তাকে বলেন যে, “আপনাদের ওদিকে লজ্জায় যাই না, একটা মেয়েকে আমাদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে, সেজন্য আমরা লজ্জিত, দুঃখিত।”
৬. সাক্ষাৎকার: ও.সি, চেয়ারম্যান (আজিজুর রহমান), বাঘাইছড়ি সদর ইউনিয়ন ও থানা নির্বাহী অফিসার
বাঘাইছড়ি সদর চেয়ারম্যান জানায় তাদের ওখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন বাঙালি এবং ৫ জন পাহাড়িকে সদস্য হিসাবে নেওয়া হয়েছে। এই কমিটির আহ্বায়ক সে নিজেই। তারা বে-সরকারি ভাবে চেষ্টা করছে পাহাড়ী বাঙালিদের সংঘর্ষ বন্ধ করার জন্য। কল্পনা চাকমা অপহরণ হওয়ার পর এলাকার পরিস্থিতি থমথমে হয়ে আছে এবং পুরো ব্যাপারটিকে একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষতঃ পাহাড়িরা এটা করেছে।
ও.সি শহীদুল্লাহ জানান তথ্যানুসন্ধানে সময় লাগবে। এটা একটা ‘ক্লুলেস’ কেস। তবে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কল্পনা চাকমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উদ্ধার করার জন্য। এটা একটা “সেনসেশনাল” কেস, তাই এই কেসটিকে নিয়ে অতি সতর্কভাবে এগুতে হবে।
থানা নির্বাহী অফিসার আমাদের জানান যে, উনি বড় ভাইয়ের জবানবন্দী নিয়েছে কিন্তু ওটা এফআইআর হিসাবে থানায় নেওয়া হয়নি। থানা নির্বাহী অফিসারের কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে স্পষ্ট ঘটনার বিবরণী দেওয়া আছে।
৭. রূপকারী এলাকা, থানা-বাঘাইছড়ি, গ্রাম-ঝগড়াবিল, সাক্ষাৎকার : সুমিতা চাকমা, সাধারণ সম্পাদিকা হিল উইমেন্স ফেডারেশন, জিতা চাকমা, সভানেত্রী, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, ইন্দ্রমুখী চাকমা (রূপনের মা) এবং হীরঙ্গ চাকমা (রূপনের বাবা)
সুমিতা চাকমা এবং ইন্দ্রমুখী চাকমা জানায় যে, ২৭ জুন ১৯৯৬ অবরোধ কর্মসূচির দিন রূপনও (১৬) অংশগ্রহণ করে। একটা সময়ে যখন পরিস্থিতি উত্তেজিত হয়ে পড়ে তখন একজন বাঙালি পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র নিয়ে রূপনকে গুলি করে। রূপন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐ দিনই মনোতোষ চাকমা (বাবা পুনেন্দুলাল চাকমা), সুকেশ চাকমা (এস.এস.সি পরীক্ষার্থী; বাবা বাঘা চাকমা) ও সমরবিজয় চাকমা (এস.এস.সি পরীক্ষার্থী; বাবা প্রতি কুমার চাকমা) নিখোঁজ হয়। তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পাহাড়িরা বন্যা ও প্রশাসনের দুর্ব্যবহারের ভয়ে বাঘাইছড়ি থানায় কোন জি.ডি করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত তাদের কোন সন্ধান মিলছে না। রূপনের মা ছেলের লাশ ফেরৎ চান। সরকারের কাছে তার দাবী এ ঘটনার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া, সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। ছেলের লাশ ফেরৎ না পেলেও যেন তার হাড়গোড় ফেরৎ পায়, যা দিয়ে ধর্মীয়ভাবে সৎকার করতে পারবে।

