কল্পনা চাকমার অপহরণের ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নির্মম প্রতীকঃ ঢাকায় বক্তারা

আইপিনিউজ বিডি, ১২ জুন, ঢাকাঃ আজ ( ১২ জুন ২০২৬) শুক্রবার পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামী নারী নেত্রী কল্পনা চাকমাকে লে. ফেরদৌস গং কর্তৃক অপহরণের ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ অডিটোরিয়ামে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তারা কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগরের সদস্য কলি চাকমা সঞ্চালনায় এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য মনিরা ত্রিপুরা, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহা তানজিম তিতিল, জনা গোস্বামী, পরিচালক, অ্যাডভকেসি এন্ড নেটওয়ার্কিং, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রীয় সদস্য লুনা নূর, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহানাজ সুমি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ সাধারণ সম্পাদক ডা. গজেন্দ্র নাথ মাহাতো, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক চন্দ্রিকা চাকমা এবং সংহতি বক্তব্য রাখেন হ্লামংচিং মারমা, সাধারণ সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ঢাকা মহানগর।
স্বাগত বক্তব্যে চন্দ্রিকা চাকমা বলেন, কল্পনা চাকমা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তিনি কেবল পাহাড়ি নারীদের নেত্রী ছিলেন না, বরং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আত্মমর্যাদার পক্ষে সোচ্চার একজন সংগ্রামী সংগঠক ছিলেন। নিপীড়িত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা অপহরণের শিকার হন। আরও দুঃখজনক হলো, ঘটনার সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের আজও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি নির্মম উদাহরণ।
হ্লামংচিং মারমা বলেন, আজ থেকে ৩০ বছর আগে নারী নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে নিজের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং পাহাড়ের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় তার সাহসী অবস্থান তাকে একটি অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন বাঘাইছড়ি-কজইছড়ি সেনা ক্যাম্পের কমান্ডার লে. ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের দ্বারা কল্পনা চাকমা অপহৃত হন। কিন্তু ঘটনার তিন দশক পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র এখনও তার সন্ধান, সুষ্ঠু বিচার এবং দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার শুনানি বারবার খারিজ হওয়ার ঘটনাকে তিনি বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করে
মনিরা ত্রিপুরা বলেন, কল্পনা চাকমা কোথায়? এই প্রশ্ন আজ তিন দশকের পুরনো। সেই ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পাহাড়ের সাহসী কন্যা, বিপ্লবী কণ্ঠস্বর, আদিবাসী নারী অধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক সংগঠক, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়। অভিযোগের তীর যাদের দিকে নির্দেশিত হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আজও কার্যকর বিচার সম্পন্ন হয়নি। ফলে কল্পনা চাকমার পরিবার যেমন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিও বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, কল্পনা চাকমার এই ঘটনা কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নির্মম প্রতীক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন একজন নাগরিক নিখোঁজ হন, যখন একজন নারী অপহরণের শিকার হন, অথচ অভিযোগের সুষ্ঠ তদন্ত ও বিচার হয় না, তখন সেই ব্যর্থতা শুধু একজন মানুষের নয় সেটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা। বিচারহীনতা অপরাধকে উৎসাহিত করে, আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে এবং গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই আজ এই আলোচনা সভা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে দাবি জানাই কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার সত্য উদঘাটনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের ভিত্তিতে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, কল্পনা চাকমা আজও প্রাসঙ্ঘিক। পাহাড়ের অগ্নিকন্যা কি আজ আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্ন থেকে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের রক্ষা করা, অপহরণ করা নয়। আজকে পাহাড় থেকে সমতলে আদিবাসী নারীদের কোনো নিরপাত্তা নেই। ধর্ষণের পর হত্যা, শ্লীলতাহানি ইত্যাদি ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে আদিবাসী নারীরা। অন্যদিকে আদিবাসী নারী হওয়ার কারনে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হলেও কোনো ঘটনার শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। বারবার এসব ঘটনার পার পাওয়ার ফলে অপরাধীরা পুনরায় এসব ঘটনা ঘটানোর সাহস পাচ্ছে। রাষ্ট্র আজ নির্বিকার, এই রাষ্ট্র এখনো জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি
ফারহা তানজিম তিতিল বলেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আজ গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। নব্বইয়ের দশকে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল সংঘাত ও অস্থিরতায় উত্তাল, তখন কল্পনা চাকমার মতো সাহসী নারীরা নিপীড়ন, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমাকে অপহরণের মাধ্যমে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অপহরণের তিন দশক পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র আজও তার সন্ধান দিতে পারেনি এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ধারাবাহিক ব্যর্থতা জনগণের আস্থা সংকটকে আরও গভীর করেছে এবং বিচারহীনতার চর্চাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।।
ডা. অজয় প্রকাশ চাকমা বলেন, কল্পনা চাকমার কি অপরাধ ছিল? তার অপরাধ ছিল তিনি একজন অধিকার কর্মী, নিপীড়িত জুম্ম জনগণের কাণ্ডারি ছিলেন, তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন, এই জন্য তিনি অপরাধী। সেই সময়ের কজইছড়ি ক্যাম্প কমান্ডার লে. ফেরদৌস এবং তার সহযোগীদের নিয়ে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে। এটি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধও। জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে থমকে দিতে রাষ্ট্র কল্পনা চাকমার মত প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে থমকে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জুম্ম জনগণ প্রতিবাদ করতে শিখেছে যখন সেই কণ্ঠ কোনদিন থামেনি এবং থামবে না। গত ৩০ টি বছরে পাহাড়ে হাজারও কল্পনা জন্ম হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শামসুল হুদা বলেন, কল্পনা চাকমাকে ১৯৯৬ সালে অপহরন করা হয়। এক কল্পনা চাকমার কণ্ঠ থামিয়ে দিতে পারলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ হাজার হাজার কল্পনা চাকমা জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে পাহাড়ের মানুষ আজও নিপীড়িত। আমরা তাদের উপর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। অন্যায় ,অবিচার বন্ধ তো হয়নি বরং আরও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২৪ শের গনভ্যুথানে আমরা ভেবেছিলাম এইবার হয়তো সকল বৈষম্য দুর হবে। পাহাড়, সমতলের আদিবাসী সহ সকল জাতির উপর থেকে নিপীড়ন মুছে যাবে। কিন্তু ইন্টারিম সরকারের আমলেও আদিবাসীদের উপর নিপীড়ন অব্যাহত ছিল। সরকার কত ঘটনা তদন্ত করে বিচার করেছে। কিন্তু কল্পনা চাকমার মত অপহরণের ঘটনার কোনো তদন্ত করতে পারেনি। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধিদের বিচারের মুখোমুখি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমান সরকারের ইতিবাচক হতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য পাহাড়ের স্থায়ী সমাধান সম্ভব এবং বিএনপি সরকারের যে রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি সেটাই চূড়ান্ত ফল পাবে।
রাজেক্কুজামান রতন বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনার বিচার আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, চিহ্নিত অপরাধী লে. ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে উৎসাহিত করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। কল্পনা চাকমার পরিবারের সদস্য ও পাহাড়ের জনগণ এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।
ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ এক করুণ বাস্তবতা বিরাজ করছে। কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র তার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে পাহাড়ে আজ নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। তিনি দ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
এছাড়াও আলোচনায় জনা গোস্বামী, লুনা নূর, জানকি চিচিম, শাহনাজ সুমিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার সুবিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর সমমর্যাদা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সুষ্ঠু ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং এই দাবিগুলো উত্থাপন করেন_
১. অবিলম্বে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা এবং যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা।
২. অভিযুক্ত কল্পনা চাকমা অপহরণকারীদের এবং রুপন, মনতোষ ও সমরবিজয় চাকমার হত্যাকারীদের অভিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার ব্যাবস্থা গ্রহণ।
৩. আদিবাসী নারী সমাজের নিরাপত্তা ও মানিবাধিকার নিশ্চিতকল্পে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অবিলম্বে সময়সীমা ভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা।


