আদিবাসীদের পরিচয়ের স্বীকৃতি একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে: চট্টগ্রামে আদিবাসী দিবসে অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

আইপিনিউজ বিডি, ৯ আগস্ট, ২০২৬, চট্টগ্রামঃ আজ ৯ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, চট্টগ্রাম অঞ্চলের উদ্যোগে চট্টগ্রামস্থ প্রেস ক্লাবের জুলাই স্মৃতি হলে “আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন: জীবন সুরক্ষা ও কল্যাণময় জীবন গঠন।”— শীর্ষক প্রতিপাদ্যে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিনবোধি ভিক্ষু, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি তাপস হোড়, ঐক্য ন্যাপ, চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি পাহাড়ী ভট্টাচার্য প্রমুখ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি আদর্শ চাকমার সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, চট্টগ্রাম অঞ্চলের শরৎ জ্যোতি চাকমা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক জাতীয় সঙ্গীত ও গণসংগীত পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক প্রেনঙি ম্রো।
অনুষ্ঠানের উদ্ভোধক আবুল মোমেন বলেন, আদিবাসী মানুষের জীবন ভূমি ও প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই আত্মিক বন্ধন আদিবাসীদের প্রকৃতভাবে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোর নানা নীতির কারণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তাদের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটের মুখে পড়েছে। আমাদের উচিত হবে তাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণ ও উদারভাবে সমাধান দিকে এগিয়ে যাওয়া। সকলে মিলে আমাদেরকে সহাবস্থানের নীতিতে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ১৯৯৭ সালে পাহাড়ের আদিবাসী জনগণের সাথে চুক্তি করেছে। সরকারের উচিত সেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার ও ভূমি সমস্যা নিরসন করা।
এছাড়াও প্রত্যকটা আদিবাসী জাতির ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য সরকারের বিশেষভাবে উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, পৃথিবীর নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীমভাবে বিবেচিত হচ্ছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে সমৃদ্ধভাবে ঠিকিয়ে রেখেছে। সেই জ্ঞানকে সম্মান জানাতে হবে এবং আধুনিকায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্যোগী হতে হবে। আদিবাসীদের পরম্পরাগত জ্ঞান এই দেশের অমূল্য সম্পদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল আদিবাসী সম্প্রদায়কে পরস্পরের সাথে আত্মিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। বিশ্বের আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ সংবিধানে আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আদিবাসী জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পঞ্চাশ বছর পূর্বে যেমন ছিলো, বর্তমানেও তেমনই রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারনের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকারের জন্য, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা ও আত্মমর্যাদার জন্য আমাদের সকলের ন্যায়সংগত লড়াইটা জারি রাখতে হবে।
দেশের আদিবাসীদের পরিচয়ের স্বীকৃতি একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভাপতি বক্তব্যে শরৎ জ্যোতি চাকমা বলেন, সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলে বাংলাদেশকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংকটে রেখে, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা জারি রেখে এই দেশ কখনো এগিয়ে যেতে পারবে না। তাই পাহাড় এবং সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্রতা রক্ষা ও তাদের বিকাশের জন্য রাষ্ট্রকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সভাপতি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্বের সমাপ্তি হয়। পরবর্তীতে রঁদেভূ, শিল্পীগোষ্ঠী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।


