পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি পার্বত্যবাসীর

আইপিনিউজ বিডি, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি লঙ্ঘন, একতরফা সিদ্ধান্ত ও জনবিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড বন্ধ করে চুক্তি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণাসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাঙ্গামাটি শহরের রাজবাড়ী সড়কের সাবারাং রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণের উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রাঙ্গামাটি আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় পার্বত্যবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে একই মন্ত্রণালয়ে মীর হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ এবং পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক সরকারি কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা আপত্তি জানান।
তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও বিদ্যমান বিশেষ শাসনব্যবস্থার সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বক্তারা মীর হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অন্যত্র পদায়নের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয় এবং তাঁকে পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, জনগণের এসব দাবির প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর সাড়া না দিয়ে গত ২৭ আগস্ট সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সময়ে মীর হেলাল উদ্দিনকে তিন পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে আপত্তি জানানো হয়। বক্তাদের অভিযোগ, এসব পরিষদে দলীয় ও জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষভাবে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি গঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকারি গেজেটেও ওই তারিখে তিনটি পৃথক কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট জনগণ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পূর্বপরামর্শ ও সম্মতি ছাড়াই এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের দাবি, কমিটিগুলোর কার্যপরিধির সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ এবং বিদ্যমান বিশেষ শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব ও কার্যপরিধির সংঘাত তৈরি হতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমস্যা নিরসন, প্রচলিত আইন ও চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা এবং জাতীয় কর্মকৌশল নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্র সচিবকে সভাপতি করে নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাই চুক্তির মূল কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তাই সরকারের উপরোল্লিখিত সকল জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রত্যাহার ও পুনর্মূল্যায়ন করা প্রযোজন। তাই আমাদের দাবী হলো-
১। জনাব মীর হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে সরিয়ে অন্যত্র পদায়ন করা এবং চুক্তি লংঘন না করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কোন প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী নিয়োগ না দেওয়া।
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব হেলাল উদ্দিনকে তিন পার্বত্য জেলার আইন-শৃংখলা, দুর্নীতি, ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনকল্যানমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারী কার্যাবলী তদারিক ও সমন্বয়ের দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদান করা।
৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের বৈধ ও উপযুক্ত প্রতিনিধির সাথে আলোচনা করে গঠিত তিনটি কমিটি: ১। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, ২। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি ও ৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি সমূহের কার্যক্রম বাতিলকরণসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তিনটি কমিটি: ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি ২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি; ও ৩. ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স; পূনর্গঠন করা।
৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার রোডম্যাপ ঘোষনা করে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।


