পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের তিনটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন সম্পর্কে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিবৃতি

আইপিনিউজ বিডি, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদকঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকার গঠিত জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক—এই তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ গ্রহণ এবং চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে পিসিজেএসএস বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে সরকার একতরফাভাবে এসব কমিটি গঠন করেছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পরিবর্তে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে তিনটি পৃথক কমিটি গঠন করে। প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি’, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি’ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি’ গঠন করা হয়।
পিসিজেএসএসের বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় কমিটির দায়িত্বের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের সমন্বয় ও তদারকি এবং জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাহী কমিটিকে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং পরামর্শক কমিটিকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরামর্শক কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে সুপারিশ এবং নির্বাহী কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশলের খসড়া প্রস্তুত করে জাতীয় কমিটির কাছে উপস্থাপন করতে হবে।
বিবৃতিতে পিসিজেএসএস দাবি করে, নির্বাহী কমিটির কার্যপরিধিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন’ এবং ‘সীমান্ত নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা না করে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পিসিজেএসএস আরও অভিযোগ করেছে, প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার এবং নতুন আইন ও বিধি প্রণয়নের সুপারিশের সুযোগ রাখার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও চুক্তি অনুযায়ী প্রণীত আইন সংশোধনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিন কমিটিতে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে পিসিজেএসএস। জাতীয় ও নির্বাহী কমিটিতে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কমিটির কার্যক্রমে ডিজিএফআইয়ের জনবল ও অবকাঠামোগত সহায়তার বিধানও রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

পিসিজেএসএস এর মতে, একটি রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাধানের জন্য গঠিত কাঠামোতে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার এ ধরনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির রাজনৈতিক সমাধানের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।
পিসিজেএসএস আরও বলেছে, জাতীয় ও নির্বাহী কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখা হয়নি। পরামর্শক কমিটিতে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পরিবর্তে একজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তিন সার্কেল চিফ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পিসিজেএসএসকে কমিটিগুলোতে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স এবং ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন পুনর্গঠন না করেই এসব কাঠামোর চেয়ারম্যানদের নতুন পরামর্শক কমিটিতে রাখা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তুলে ধরে পিসিজেএসএস অভিযোগ করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে কার্যকর না করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিষদকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটি দাবি করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে আঞ্চলিক পরিষদকে অঞ্চলের প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়নি।

পিসিজেএসএসের বিবৃতিতে বিএনপি সরকারের অতীত ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, ১৯৯১-১৯৯৫ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ১৩টি আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর চুক্তি বাস্তবায়নসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন এবং কিছু বিষয় পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমান সরকারের তিন কমিটি গঠনের উদ্যোগকে সেই ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে পিসিজেএসএস। সংগঠনটির ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা এবং এর সমাধানে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানাচ্ছে যে–
১। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি অবিলম্বে বাতিল করা।
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি পুনর্গঠন পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) গ্রহণ করা।
৪। প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদ সংরক্ষণ না করা।


