বিশেষ প্রতিবেদন

এম এন লারমার আদর্শ ধারণ করেই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবেঃ রাঙ্গামাটিতে এম এন লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকীতে আলোচকরা

আইপিনিউজ বিডি, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার (এম এন লারমা) ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাঙ্গামাটিতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাঙ্গামাটি শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি-২০২৬’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির চাকমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এম এন মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা, বিশিষ্ট আইনজীবী সুস্মিতা চাকমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা।

আলোচনা সভার আগে উদীয়মান কবিদের অংশগ্রহণে কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উদযাপন কমিটির সদস্য রীনা চাকমা। পরে উদযাপন কমিটির সদস্য নান্টু ত্রিপুরা ও আশিকা চাকমার সঞ্চালনায় মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন কমিটির সদস্য সচিব জুয়েল চাকমা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিশির চাকমা বলেন, এম এন লারমা মাত্র ৪৪ বছর বেঁচেছিলেন। স্বল্পায়ু হলেও তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রশ্নটি বারবার সামনে এনেছেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার স্বীকৃতির দাবি তুলে ধরেছিলেন।

তিনি বলেন, সংখ্যায় ক্ষুদ্র হলেও জুম্ম জনগণ স্বতন্ত্র জাতিসত্তা, আত্মমর্যাদা ও আত্মমূল্যবোধসম্পন্ন জাতি—এ বিষয়টি দেশে-বিদেশে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এম এন লারমার ভূমিকা অনন্য। তিনি সংসদে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে শিশির চাকমা বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তির মূলভিত্তি বিএনপি সরকারের সময়েই রচিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে বিএনপি চুক্তি বাস্তবায়নের দায় এড়াতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভূমি বেদখল, সেনাক্যাম্প বৃদ্ধির দাবি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও ১৯০০ সালের শাসনবিধি বাতিলের দাবি জোরালো হওয়া উদ্বেগজনক। গত ১০ সেপ্টেম্বর পার্বত্যবাসীর কোনো ধরনের সম্মতি ও সমঝোতা ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি শুধু জেএসএসের দাবি নয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিকে সর্বজনীন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ কী বলতে চায় এবং কী ভাবছে, সরকারকে তা শুনতে হবে।

ঊষাতন তালুকদার বলেন, বর্তমান সময়ে এম এন লারমার অবদান ও আদর্শ নতুনভাবে জানার এবং চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি জুম্ম জনগোষ্ঠীকে প্রগতিশীল, মুক্তিকামী ও সংগ্রামের পথে ধাবিত করেছিলেন। শুধু পাহাড়ের নেতা হিসেবে নয়, বিশ্বের নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের নেতা হিসেবেও এম এন লারমাকে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, এম এন লারমার মানবতাবাদী আদর্শ ধারণ, চর্চা ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমান সময়ে জুম্ম জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংকট, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও নানা ধরনের চাপের মধ্যেও অনেকেই আত্মমগ্ন হয়ে রয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি কমিটি গঠন প্রসঙ্গে ঊষাতন তালুকদার বলেন, সরকার কী উদ্দেশ্যে এসব কমিটি গঠন করেছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইউটিউবে প্রচারিত নানা ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেই। সংবিধান ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মেনেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আবেগ দিয়ে নয়, বস্তুনিষ্ঠভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এখানকার মানুষকে ‘সৎ মায়ের সন্তান’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

এ সময় জুম্মদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়েও কথা বলেন ঊষাতন তালুকদার। তিনি ইউপিডিএফের পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবির সমালোচনা করে সংগঠনটির বিরুদ্ধে সাবেক শান্তিবাহিনীর সদস্যদের হত্যার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগও তোলেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজয় কেতন চাকমা বলেন, এম এন লারমার রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিকাশে তাঁর পরিবারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জাতি হিসেবে শক্তিশালী হতে হলে পরিবার ও সমাজে সাহসী, সচেতন ও আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নিজের জাতি ও সমাজকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা অবশ্যই ধারণ করতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সাহসী, প্রতিবাদী ও আদর্শিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বর্তমান জুম্ম সমাজের ঐক্যের অভাবের সমালোচনা করে বিজয় কেতন চাকমা বলেন, নিজেদের অধিকার কেউ কাউকে দিয়ে দেয় না; নিজেদের অধিকার নিজেদেরই আদায় করে নিতে হয়। একই সঙ্গে তিনি ইউপিডিএফের পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবিকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে সংগঠনটিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথি আইনজীবী সুস্মিতা চাকমা বলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এম এন লারমা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে বর্তমান প্রজন্ম যথাযথভাবে ধারণ করতে পারছে না।

তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হয়ে গেছে। তাই চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে শুধু জেএসএস বা আঞ্চলিক পরিষদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে চলবে না; এ আন্দোলনকে সবার আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও নানা প্রলোভনের কারণে অনেকেই অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এসব স্বার্থপরতা থেকে বেরিয়ে এসে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে দোষারোপের রাজনীতি পরিহার করে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এম এন লারমার আদর্শ ও জীবনসংগ্রাম ছড়িয়ে দিতে আলোচনা, পাঠচক্রসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই এম এন লারমা জুম্ম জনগণের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। তৎকালীন সামন্তসমাজের প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তিনি কারাবরণ করেছিলেন।

তিনি বলেন, আত্মমুখীনতাকে প্রাধান্য না দিয়ে জুম্ম জনগণের সামগ্রিক কল্যাণে এম এন লারমা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর সমগ্র জীবনের শিক্ষা বর্তমান ছাত্রসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠেয়। সেই শিক্ষা ধারণ করে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রসমাজকে নেতৃত্বের হাল ধরতে হবে।

অনুষ্ঠানে এম এন লারমার জীবন, আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

Back to top button