আঞ্চলিক সংবাদ

পিসিপি কাউখালী থানা শাখার ১৯তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ “সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হউন” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার) পিসিপি কাউখালী থানা শাখার ১৯তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কাউখালী থানা কমিটির সভাপতি হ্লাচিমং মারমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি কাউখালী থানা কমিটি সহ-সাধারণ সম্পাদক পূর্ণধন চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা, পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ম্যাগলিন চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙ্গামাটি জেলা কমিটি সাধারণ সম্পাদক এলি চাকমা প্রমুখ।

সম্মেলনে কাউখালী থানা শাখার সহ-সভাপতি রসিক তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে ও সহ-সাধারণ সম্পাদক সঞ্চয় তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাউখালী থানা শাখার সদস্য সৈকত চাকমা।

সম্মেলনের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এযাবৎকালে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

প্রধান অতিথি হ্লাচিমং মারমা বলেন, স্মরণাতী কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যার শিকার হয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ডজনেরও অধিক গণহত্যা হয়েছিলো। সেই গণহত্যা গুলোর মধ্যে প্রথম ১৯৮০ সালে ২৫ মার্চ কাউখালী কমলপতি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো। কিভাবে জুম্ম জনগণকে হত্যা করা হয়েছিলো আমরা কখনো ভুলতে পারি না এবং ভুলবো না। তাই শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াইয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

পূর্ণধন চাকমা বলেন, একটি জাতি বা সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র যুব সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। একদিকে শাসকগোষ্ঠীর শাসনের কায়েম অন্যদিকে সমাজের নানা প্রতিক্রিয়াশীল সুবিধাবাদী চরিত্রের মানুষ বসবাস রয়েছে। এই সবকিছু ছাত্র-যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোকাবেলা করতে হবে। সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখার জন্য ছাত্র-যুব সমাজকে মাদকাসক্ত থেকে বিরত থেকে সমাজের ছাত্র যুবকদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

সুপ্রিয় তনচংগ্যা বলেন, পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে শাসকগোষ্ঠী সামরিক উপায়ে শাসনের কায়েম জারি রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প দ্বারা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। যে সেনাক্যাম্পগুলো চুক্তির মাধ্যমে প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও চুক্তির এত বছর পেরিয়ে গেলেও জুম্ম জনগণ এখনো সেনা ছাউনি থেকে মুক্ত হতে পারেনি। প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার মাধ্যমে জুম্ম জনগণের মাঝে ভয়ের সংস্কৃতি জিইয়ে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যেভাবে ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ চালিয়েছিলো সেভাবে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঔপনিবেশিক কায়দায় শাসন-শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্য, জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এম.এন লারমা ঘুণেধরা সমাজ ব্যবস্থার উপর আঘাত করে ঘুমন্ত জুম্ম জনগণকে জাগিয়ে তুলে আন্দোলন সংগ্রামের বীজ রোপণ করেছিলেন। বিজাতীয় শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এম.এন লারমা যে আন্দোলন শুরু করেছে ছাত্র সমাজকে সে আন্দোলন সংগ্রামে অধিকততরভাবে সামিল হতে হবে।

ম্যাগলিন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস হলো শাসন-শোষণের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমল হতে বর্তমান পর্যন্ত যে পরিস্থিতি বাস্তবতা পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসন-শোষণই হয়ে আসছে। দেশ ভাগের পরেও পাকিস্তানের শাসনের আবদ্ধে ছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাকিস্তান সময়ে ১৯৬০সালে কাপ্তাই বাঁধের মধ্যে দিয়ে জুম্ম জনগণের ৫৪হাজার একর ধান্য জমি পানিতে তলিয়ে যায়। লক্ষাধিক জুম্ম জনগণকে নিজ ভিটামাটি থেকে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে, শরণার্থী জীবনযাপন কাটাতে হয়েছে। একেরপর এক কার্যক্রমের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব মুছে দিতে নানাভাবে তখন থেকে ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ ভেবেছিলো এই দেশের শাসক জুম্মদের দুঃখ কষ্ট বেদনার কথা বুঝবে। কিন্তু দেখা গেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও জুম্ম জনগণ সেই শাসন-শোষণের কায়েম থেকে মুক্ত হতে পারেনি। জুম্ম জাতির অস্তিত্ব বিলীন করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধভাবে রাবার কোম্পানির নামে, উন্নয়নের নামে ভূমি বেদখলসহ জুম্ম জাতি গোষ্ঠীকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিটি পাড়ায় মসজিদ নির্মাণ করা হলেও একটি স্কুল বা সুচিকিৎসার জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এলি চাকমা বলেন, স্বৈরশাসক সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশে নতুন বিএনপি সরকার গঠন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো আন্তরিকতা জুম্ম জনগণ দেখতে পায়নি। বরং চুক্তিকে লঙ্ঘন করে বর্তমান সরকার নানা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। চুক্তির এত বছর পরেও মৌলিক বিষয়গুলো সরকার বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। উল্টো চুক্তি বাস্তবায়ন করছে বলে নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের জাতি ও অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্র সমাজকে সচেতন থাকতে হবে।

কাউন্সিল অধিবেশনে আর্য্য চাকমাকে সভাপতি, সৈকত চাকমা কে সাধারণ সম্পাদক এবং সুজয় মারমা কে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট কাউখালী থানা শাখা কমিটি গঠন করা হয়। নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুনীতি বিকাশ চাকমা।

Back to top button