শিল্প ও সংস্কৃতি

পাহাড়ের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড গেংখুলি–এর অন্যতম সদস্য উত্তম দেওয়ান আর আমাদের মাঝে নেই।

আইপিনিউজ বিডি, ১৭ জুলাই, ডেক্স রিপোর্টঃ পাহাড়ের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড গেংখুলি–এর অন্যতম সদস্য উত্তম দেওয়ান আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর প্রয়াণে পাহাড়ের সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে এক গভীর শোকের ছায়া।

তার প্রয়াণে অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন,

উত্তম দেওয়ানের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও চাকমা সার্কেল চীফ রাজা দেবাশীষ রায় তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “উত্তম দেওয়ানের প্রয়াণ আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন। আমরা একসঙ্গে কলেজে অধ্যয়ন করেছি। তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও স্মৃতি রয়েছে।”

তিনি বলেন, “উত্তম দেওয়ান গেংখুলি ব্যান্ডেরও একজন দক্ষ গিটারিস্ট ছিলেন। তবে তিনি শুধু একজন গিটারবাদক ছিলেন না; তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ সৃজনশীলতা ও বহুমুখী প্রতিভা। তিনি পাহাড়ের বাস্তবতা, মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ‘ও ভেইলগ হজ্জে বাজেদং আর হদক’ সহ তাঁর অনেক গান পাহাড়ের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে।”

দেবাশীষ রায় আরও বলেন, উত্তম দেওয়ান ছিলেন একজন প্রতিবাদী শিল্পী। তাঁর গানের কথায় প্রায়ই প্রতিবাদের ভাষা উঠে আসত। পাহাড়ের মানুষের অধিকার, বেদনা ও বাস্তবতা নিয়ে তাঁর সৃষ্ট প্রতিবাদী গানগুলো আজও মানুষকে ভাবায় এবং নাড়া দেয়। তার, পশ্চিমা সংগীতধারার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি গিটার বাজানো, গান করা ও সুর সৃষ্টিতে ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। পাশাপাশি মাউথ অর্গান বাজাতেও তিনি ছিলেন অসাধারণ পারদর্শী। অনেক সময় তিনি আমার থেকেও ভালো মাউথ অর্গান বাজাতেন। চাকমা সংগীতের জগতে উত্তম দেওয়ান একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সুর, সংগীত ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতা পাহাড়ের সংগীতকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মানবাধিকার কর্মী ও এইআইপিপির সেক্রেটারি জেনারেল পল্লব চাকমা তার সোশাল মিডিয়ায় স্মৃতিচারণ করে লিখেন, “উত্তম দেওয়ান মানি – রাঙ্গামাটি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক চাকমা গানের অন্যতম রূপকার, গেংহুলী ব্যান্ডের সেই কণ্ঠ, যিনি আমাদের প্রজন্মকে চাকমা গানের সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালের বিজু উৎসবের সেই দিনটা আজও চোখে ভাসে। আমার দেখা গেংহুলী ব্যান্ডের প্রথম কনসার্ট। রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছিল তখন শুধু উত্তর অংশে, জিমনেসিয়ামের দিকটায়। মঞ্চ প্রস্তুত । সন্ধ্যার একটু পরে, আধো আলো আধো আধারিতে, দর্শকের উল্লাস আর করতালির মধ্যে স্টেজে উঠলেন রুপায়ন দেওয়ান রাঙা, উত্তম দেওয়ান মানি আর তাদের সাথীরা। গ্রাম থেকে শহরে এসে ব্যান্ডের তালে চাকমা গান শোনার সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ক্যাসেট প্লেয়ারের বাইরে প্রথমবার সরাসরি কানে শুনেছিলাম ‘হুদু গেলে ধনপুদি’, ‘চোত মাচ্চে জুন পহরত’, ‘মোনতলা আদামর তান্যেবি’, ‘দেবান্ন্যেলোয় দেবানি’, ‘বেক পিড়ে দারু আগে রেচ্চো পিড়ের দারু নেই’-এর মতো গান। সেদিন দর্শকদের সাথে সাথে ব্যান্ডের সদস্যরাও নেচে গেয়ে চিনিয়ে দিয়েছিলেন গেংহুলী আর আধুনিক চাকমা গানের শক্তি। আমার মত শত শত কিশোর তরুণের বিজুর আনন্দ সেদিন শতগুণে বেড়ে গিয়েছিল তাদের পরিবেশনায়। মনে আছে কালিন্দীপুর থেকে আমরা একঝাক কিশোর ছুটে গিয়েছিলাম সেই কনসার্ট দেখতে। শেষে একরাশ তৃপ্তি আর বিস্ময়ভরা আনন্দ নিয়ে কনসার্টের গানগুলো গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন রাতে”।
আমার দেখা সেদিনের সেই প্রজন্মের গেংহুলী শিল্পীদের, আমাদের সেই হিরোদের পরিবেশনা, তাদের গায়কী আজও স্মৃতিতে সমান উজ্জ্বল হয়ে আছে। কয়েক বছর আগে আমরা হারিয়েছি রুপায়ন দেওয়ান রাঙাকে, আজ বিদায় নিলেন উত্তম দেওয়ান মানিও। একে একে সেই প্রজন্মের কিংবদন্তীরা চলে যাচ্ছেন, রেখে যাচ্ছেন শুধু সুর আর স্মৃতি।
উত্তম দেওয়ান মানি চলে গেলেন, কিন্তু তার গান, তার কণ্ঠ, আর সুমধুর সুরে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরদিন। বিদায় গুণী শিল্পী।

লুম্বিনী রায় লিখেন,আমার সংগীত গুরু, আমি আপনার সঙ্গে গান গাইতে গাইতেই বড় হয়েছি। মনে আছে, আমি সবসময় আপনাকে অনুরোধ করতাম—আমি যখন গান গাইবো, তখন যেন আপনি কিবোর্ড বাজান।
চাকমা সংগীতের এক কিংবদন্তির এই চলে যাওয়ায় আমি গভীরভাবে শোকাহত। আপনাকে অনেক মিস করবো। আপনার সঙ্গে গান গাওয়ার স্মৃতিগুলো আমি চিরকাল হৃদয়ে লালন করবো।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ইমতিয়াজ মাহমুদ তার সোশাল মিডিয়ায় লিখেন, “মানি দা আর নেই। অনায়াস নৈপুণ্যে পাহাড়ের অরণ্যের কথা এইরকম শিল্পিত রূপে আর কে আমাদের শোনাবে! রাঙামাটির নানা কনসার্টের ক্যাজুয়াল ভিডিও দেখতাম ফেসবুকে নানাজনে পোস্ট করে- মাঝে মাঝে দেখতাম, গেংখুলি গাইছে, নিজে নিজেই চিৎকার করে উঠতাম, মানিদা মানিদা, ঐ যে আমাদের মানিদা। কিছু কিছু মানুষ থাকে পৃথিবীতে যাদের সাথে আপনার নিত্যদিনের অথাবসা তো হয়না, তথাপি মনে হয় আমার আপনজন, আমার বড় ভাই, আমার বন্ধু, আমার পছন্দের মানুষ। মনে হয় না অনেকের ক্ষেত্রে এরকম? আমার কাছে মানিদা ছিলেন সেরকম” ।

লিটন চাকমা সোশাল মিডিয়ায় বলেন, পুরো জুম পাহাড় থেকে আরো একজন লিজেন্ডকে হারালাম। আমাদের কলেজ গেইট মন্ত্রী পাড়া নিবাসী গানের কিংবদন্তি উত্তম দেওয়ান (মানি) আজু আমাদের মাঝে আর নেই। আজুর গেয়ে যাওয়া গানগুলো পুরো জুম পাহাড়ে প্রজন্ম টু প্রজন্মদের কাছে রয়ে যাবে। যেখানে যান সেখানে ভালো থাকবেন আজু।

উত্তম দেওয়ান (মানি)র অনেকগুলো গানের মধ্য ‘ন লাইজ্জ তারারে’, ‘ও ভেইলগ’, ‘মোনতোলা আদামর তান্নেবি’ বিখ্যাত। “গেংখুলির” গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; তাদের সুর ও কথায় উঠে এসেছে জুম, পাহাড়, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সংগ্রাম এবং হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাসের গল্প। পাহাড়ের সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ও ঐতিহ্যকে তারা গানের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছে। আজও তাদের গান শুনলে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যেন নতুন করে হৃদয়কে স্পর্শ করে, জাগিয়ে তোলে শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের অনুভূতি।

Back to top button