নির্বাচন ও প্রান্তিক মানুষের ভাবনা – জুয়েল মারাক

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আওয়াজ উঠেছে। এর আগে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন হলো। তারও আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল।
নির্বাচনী হাওয়া গায়ে মাখাতে সবাই যখন ব্যস্ত, তখন প্রতিবারের মতো ও বরাবরের মতো উপেক্ষিত থাকছে, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের প্রসঙ্গ।
এর আগে যতো নির্বাচন হয়েছে, কোনোটাতেই তেমন একটা প্রতিনিধিত্ব উঠে আসেনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো থেকে। সেটা হোক স্থানীয় সরকার নির্বাচন, হোক তা সংরক্ষিত আসন কিংবা জাতীয় সংসদ। ফলাফলে কী হয়েছে? প্রান্তিকরা প্রান্তিকই থেকে গেছে। হ্যাঁ, সামান্য কিছু কাজ তো হয়েছেই, তাতো হতেই হবে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে, ভোটে জিততে, মনে জায়গা করে নেয়ার খেলায়, এসব তো করতেই হয়।
কিন্তু সত্যিকারের ভালো কি হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর? আমার ব্যক্তিগত অভিমত- না! হয়নি। যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধি হয়েছেন জাতীয় সংসদে ও স্থানীয় সরকারে, তারা কি সত্যিকারের ভালো করেছেন নিজেদের জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য? উল্লেখযোগ্যভাবে নেই। উল্টো কী হয়েছে? নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছেন নানাভাবে। এবং আরেকটি বড় আলাপ- তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে কাজ করেছেন।
তাহলে? স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা গভীরভাবে ভাবতে পারি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রেও তাই। হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কথা কেন তুললাম? বলছি তাহলে। মন দিয়ে পড়ুন।
বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভালোবাসেন বলে দাবি করেন, তাদের ওপর ভরসা করে আর কতোদিন থাকা যায়? অতীতে এর কোনো প্রমাণ নেই। বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে না। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্ব ও পরিচয়ই স্বীকার করে না। যারা স্বীকার করেন, তাদের বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র সম্পর্কে শুরুর দিকেই বলা হয়েছে।
সেক্ষেত্রে দায়িত্বটা সব দিক থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোরই। অর্থাৎ নিজেদের জন্য, নিজেদের হয়ে প্রতিনিধিত্বটা, নিজেদেরই করতে হবে। এটাই একমাত্র উপায়। এর কোনো বিকল্প অন্তত আমি দেখি না।
এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে, বৃহৎ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে। সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক লেখাপড়া ও বোঝাপড়া থেকে শুরু করে, সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে রাজনৈতিক সংগঠন ও পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল। হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নিজেরা এককভাবে রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গড়লো, পরবর্তীতে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে ঐক্য গড়লো। একেবারে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়, এমনকি বৈশ্বিক পর্যায় পর্যন্ত, সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগোতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গঠন এবং পরবর্তীতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, জয়ী হওয়া ও প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে যাবতীয় করণীয় নিয়ে, বেশ গুরুত্ব দিয়েই ভাবতে হবে এবং অনিবার্যভাবে এসবের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, পাহাড়ের আদিবাসীদের রাজনৈতিক সংগঠন আছে। সমতলের আদিবাসীরাও একটি গড়ে তুললো। তারা মিলেমিশে, একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক সংগঠন বানাতে পারে। পরবর্তীতে প্রক্রিয়াগতভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে। এক্ষেত্রে সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীরা আলাদা করেও রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে। ওদিকে ধরা যাক, চা শ্রমিকরা নিজেরা একটা রাজনৈতিক সংগঠন ও পরে রাজনৈতিক দল গঠন করলো। আবার আরেকদিকে, বেদে অথবা কায়পুত্ররা বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা অথবা হরিজনরা একইভাবে রাজনৈতিক সংগঠন ও পরে রাজনৈতিক দল গঠন করলো।
এভাবে পর্যায়ক্রমে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে, বৃহৎ ঐক্য বা জোট গঠন করতে পারে। এই ঐক্য বা জোট, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়াই করবে। এমনকি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মেও, প্রতিনিধিত্ব করবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে।
এখানে কথা আছে। স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব মানে শুধু নিজেদের ভালো করা নয়। বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালিদের বাদ দিলে চলবে না। কেননা প্রতিনিধি হলে, সবাইকে নিয়েই ভাবতে হবে। নিজের এলাকা তো বটেই, জাতীয় পর্যায় নিয়েও ভাবতে হবে। অর্থাৎ দেশের জন্য ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন অঞ্চলের, প্রান্তিক ও মূলধারার জনগোষ্ঠীগুলোর ভালোর জন্য। ভাবতে হবে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভালোর জন্য।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে, এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর প্রার্থীদেরকে, বাঙালিরা সমর্থন করবেন কি না ও ভোট দেবেন কিনা। চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়, প্রাথমিক অবস্থায় দেবে না। একেবারেই যে কেউই দেবে না, তা না। তবে সেই সংখ্যা আমলযোগ্য নয়। এ কারণেই আমি বৃহৎ কর্মসূচির কথা বলছি। যেসব কর্মসূচি রাজনৈতিক লেখাপড়ার ও বোঝাপড়ার। যেসব কর্মসূচি রাজনৈতিক সংগঠন ও পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক ঐক্য/জোট গঠনের। দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ভালো চাইলে, নিজেদের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে, এটাই করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এটাকেই আমি সেরা উপায় বলে মনে করছি।
এসব করতে করতে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো যদি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য আন্তরিকভাবেই সুচিন্তা করে ও কাজ করে, তাহলে সেটা ইতিবাচক। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যেন কেউ এক্ষেত্রে ফায়দা না নেয়। এবং এটাও নিশ্চিত করতে হবে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো থেকে কেউ যেন নতুন করে ওইসব রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে কাজ না করে।
যত যাই হোক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের হয়ে, নিজেদের জন্য প্রতিনিধিত্ব করার কাজ থেকে পিছিয়ে যাওয়া চলবে না। মোদ্দা কথা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গঠন করে, স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করতেই হবে।
আমি নিশ্চিত, এমন ভাবনা অনেকেই ভাবে। এই ভাবনাটার কলেবর বড় করতে হবে। এটুকুই।
তাহলে আর দেরি কেন? কীসের এত সংশয়?
(ঈষৎ সম্পাদিত লেখা)
জুয়েল মারাক- সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী


