মতামত ও বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রত্যাশাঃ শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আজ। প্রতি বছর ৯ আগস্ট পালন করা হয় এই দিবসটি। এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, সভা-সমাবেশ, বাগবিতন্ডা হবে আবার তা আদিবাসী দিবস পার হয়ে যাওয়ার পর থিতিয়ে যাবে। দিনশেষে আদিবাসীদের প্রাণের দাবিগুলো আলোর মুখ দেখবে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই দিনটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। দিবসটি উদযাপনের মূল লক্ষ্য হলো আদিবাসীদের জীবনধারা, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি তথা আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করে তোলা। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে আদিবাসীদের যে সাফল্য ও অবদান রয়েছে তার স্বীকৃতি হিসেবেও দিনটি উদযাপিত হয়। এ দিবসটি শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার দিবস নয়, দেশের আদিবাসী তথা সংগ্রামী জনসাধারণের অধিকার আদায়ের দিবসও বটে। এ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অধিকারবঞ্চিত আদিবাসীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নামে।

বিশ্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ ও চর্চাকে অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয়। বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার পাশাপাশি তাদের অবদান ও অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ।

১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট জেনেভায় জাতিসংঘের বৈঠকের পর জাতিসংঘ কর্তৃক আদিবাসী জনসংখ্যা সংক্রান্ত প্রথম ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়। বৈঠকে জাতিসংঘের সংস্থাকে আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করাই এর প্রধান লক্ষ্য ছিল। ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রতি বছর জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বার্ষিক প্রকল্প এবং বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এ বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো: “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আদিবাসী তরুণরাই মূল শক্তি”।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের ৯০টি দেশে ৪৮ কোটি ইনডিজিনাস পিপলস বা আদিবাসী বাস করে, যাদের অধিকাংশই অধিকারবঞ্চিত। অনেক দেশে আদিবাসীরা স্বীকৃতিই পায়নি। কোনো কোনো দেশে ফার্স্ট নেশনস, এবরিজিনাল, নেটিভ পিপল, ট্রাইবাল, জনজাতি, উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে আদিবাসী শব্দ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বাংলাদেশ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের হিসেবে আখ্যায়িত করলেও বাংলাদেশের আদিবাসীরা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ নয় বরং ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায় আদিবাসীরা। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ সত্তে¡ও দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে প্রতি বছর বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন আয়োজনে উদযাপিত হয়ে থাকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস।

স্বাধীন দেশেও বছরের পর বছর ধরে আদিবাসীরা নির্যাতিত হয়ে আসছে, প্রভাবশালীরা তাঁদের জমি কেড়ে নিয়ে বাস্তচ্যুত্ত করছে। ভূমিকে মায়ের মতো বিবেচনা করায় ভূমিকে খন্ড-খন্ড করতে চায়নি ভূমিপুত্ররা। গুরুত্ব দেয়নি দলিল বা নথিপত্র সংরক্ষনকে। ফলে এক শ্রেণির ভূমিদস্যুরা আদিবাসীদের জমি বেদখল করে তাদের অনেকটাই নিজভূমে পরবাসী করে রেখেছে। ১৯৫০ সালের বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব আইনের প্রয়োগ না থাকায় আদিবাসীদের জমি বেহাত হওয়ার পথ আরো সুগম হয়েছে, হচ্ছে। সঙ্গত কারনেই সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বাধীন মন্ত্রণালয় ও পৃথক ভ‚মি কমিশন গঠন সময়ের দাবী। সর্বোপরি নির্বাচনী ইসতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরনে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা জরুরী।

২০১০ সালের ১২ এপ্রিল প্রণীত ২৩ নং আইন ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ এর তফসিলে প্রথমত ২৭টি জনজাতিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে আইনটির তফসিল সংশোধনপূর্বক ৫০টি জনজাতির তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রকৃত আদিবাসী রবিদাস, রাজভর, কর্ণিদাস, নুনিয়াসহ আরো অনেক জাতিসত্ত্বাকে তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে। এছাড়াও চা বাগানে অনেক জনগোষ্ঠী/সম্প্রদায় রয়েছে যারা স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও উৎপাদন পদ্ধতির ধারক-বাহক। তাদেরকেও আইনের তফসিলে যুক্ত করা জরুরী। নয়তো ঐসকল জাতিগোষ্ঠী গেজেটের বাইরে থাকায় তাদের কাঙ্খিত উন্নয়ন ও বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। তাই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থেই বাদপড়া আদিবাসীদের দ্রুত গেজেটে অন্তর্ভূক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, এমনটাই কাম্য।

আদিবাসীদের অন্যান্য দাবিগুলো হচ্ছে: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সময়সূচি ভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণা করা; আদিবাসীদের ভূমিতে তাদের স্বাধীন পূর্বসম্মতি ছাড়া ইকোপার্ক, সামাজিক বনায়ন, টুরিজম, ইপিজেড বা অন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না করা; জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে গৃহীত ‘আদিবাসী’ বিষয়ক ঘোষণাপত্র ও আইএলও ১৬৯ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন ও আইএলও কনভেনশন ১০৭ বাস্তবায়ন করা; গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জের বাগদা ফার্মে তিন আদিবাসী হত্যার বিচার ও রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সেচের পানি না পেয়ে দুই আদিবাসীর আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের বিচার; সারাদেশে আদিবাসীদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, হয়রানি বন্ধ করা এবং আদিবাসীদের নামে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাৎ ও ভূমি অফিসের দুর্নীতি বন্ধ করা; জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণ বা আসন বরাদ্দ রাখা; সরকারি প্রথম শ্রেণিতে পূর্বের মতো ‘আদিবাসী কোটা’ সংরক্ষণ করতে হবে এবং অন্যান্য চাকরিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি কোটা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ উদযাপন করা।

আসুন আমরা এই দিবসে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতির পাশাপাশি উদ্‌যাপন করি। অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ গড়তে সচেষ্ট হই। কাউকে পেছনে না ফেলে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের প্রত্যয়।

শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ, সহ সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বগুড়া জেলা শাখা।

Back to top button