কুয়াকাটার ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের ভূমি দখলে নিতে চায় পানি উন্নয়ন বোর্ড:
সতেজ চাকমা, পটুয়াখালী থেকে ফিরে: পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায় অবস্থিত বহু প্রাচীন একটি বৌদ্ধ মন্দির শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার। সুপ্রাচীন কাল থেকে বসবাস করা রাখাইন আদিবাসীরা এই বৌদ্ধ বিহারে উপাসনা করে থাকেন। মন্দিরটির উপাধ্যক্ষ ও বিহার পরিচালনা কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু আইপিনিউজকে বলেন, “এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা ১৭৮৪ সালে। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের সময় এই মন্দিরটি ট্যাক্স মুক্ত স্থাপনা হিসেবে সরকারী দলিলে অন্তর্ভুক্ত হয়। সম্ভবত ১৯৬৫ সাল বেড়ী বাঁধ নির্মাণের সময় আমাদের মন্দিরের জায়গাও অধিগ্রহন করা হয়। আমরা সবার স্বার্থে সে জায়গা সরকারকে প্রদান করেছিলাম।” কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের জমি দখল হতে হতে মন্দিরটির পরিসর ছোট হয়ে এসেছে বলে দাবী করেছেন স্থানীয় রাখাইনরা।
গত ১৬ জুন শুক্রবার, ঢাকা থেকে এক নাগরিক প্রতিনিধি উক্ত মন্দিরটি পরিদর্শনে যায়। সরেজমিন পরিদর্শনের সময় দেখা যায় উক্ত বৌদ্ধ মন্দিরটির লাগোয়া দক্ষিণ পাশ দিয়েই স্থাপন করা হয়েছে বেরি বাঁধ। উক্ত বাঁধটি নির্মাণের সময়ও বৌদ্ধ বিহারটির জায়গা অধিগ্রহন করা হয়েছিল বলে দাবী করেন মন্দির সংশ্লিষ্ট রাখাইন আদিবাসীরা। নাগরিক প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ নাজমুল হক প্রধান, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, সাংবাদিক ও আইনজীবি অ্যাডভোকেট প্রকাশ বিশ্বাস, সাংবাদিক হারুন আল রশীদ, নিউ এইজ এর সাংবাদিক ইমরান হোসেন, আইপিনিউজ এর উপ-সম্পাদক সতেজ চাকমা, নাগরিক উদ্যোগ এর গবেষক ফারহান হোসেন জয় প্রমুখ।
এদিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরটির পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত একটি বহুবর্ষী বটবৃক্ষ এবং সেই বৃক্ষকে ঘিরে রয়েছে রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি চৈত্য। যে চৈত্যটিতে তাঁরা পূজা অর্চনা করে থাকেন। সেই ৩ শতক জায়গার একপার্শ্বে জায়গাটির দেখাশোনার জন্য মো: ইউসুফ খলিফা নামের এক ব্যবসায়ীর কাছে দোকান নির্মাণ করে ভাড়াও প্রদান করেছে বিহার কর্তৃপক্ষ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ উক্ত ইউসুফ খলিফার নামে উচ্ছেদ নোটিশ জারি করে পান উন্নয়ন বোর্ড।

উক্ত জায়গাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন দাবি করে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আরিফ হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়, বাপাউবো, কলাপাড়া, পটুয়াখালী এর আওতাধীন পোল্ডার নং-৪৮ এর কলাপাড়া উপজেলাধীন মহিপুর থানাধীন কুয়াকাটা রাখাইন মার্কেট সংলগ্ন বেড়ী বাঁধের ভিতরের অংশ বরোপিটের তফসিল বর্ণিত জমিতে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে ভোগ দখল করিতেছেন যাহা সরকারী সম্পত্তি স্থায়ীভাবে দখলের উদ্যোগ। নোটিশ পাওয়ার সাতদিন পর জায়গাটি দখলমুক্ত করার নির্দেশও প্রদান করা হয় উক্ত নোটিশে।
বিহার পরিচালনা কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু আইপিনিউজকে বলেন, এ বছরের এপ্রিল মাসের ১৭/১৮ তারিখের দিকে কুয়াকাটার স্থানীয় সাংবাদিকরা উক্ত জমিটি পরিমাপ করতে আসে। তখন আমরা জানতে পারি কুয়াকাটা প্রেসক্লাব নির্মাণের জন্য প্রেসক্লাবের কাছে এই জমিটি লীজ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তখন থেকেই আমরা ঐ জায়গাটিতে কিছু করতে গেলে আমাদেরকে বাঁধা প্রদান করা হয়।
এদিকে নাগরিক প্রতিনিধি দল উক্ত জায়গাটি পরিদর্শন করতে গেলে সেখানে সরেজমিন উপস্থিত ছিলেন কুয়াকাটা প্রেস ক্লাবের সভাপতি নাসির উদ্দীন বিপ্লব। পরিদর্শনরত প্রতিনিধি দলকে তিনি বলেন, বহুবছর ধরে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি জায়গায় প্রেসক্লাব স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কিন্তু আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে নতুন প্রেস ক্লাব স্থাপনের জন্য জায়গার লীজ চেয়েছি। তারা আমাদের এই নির্ধারিত জায়গাটিই বরাদ্দ দিয়েছে। তবে আমরা সাংবাদিকরা সবসময় রাখাইন আদিবাসীদের পক্ষে ছিলাম এবং থাকবো। তাঁদের জায়গা দখল করে আমরা প্রেসক্লাব নির্মাণ করতে যাবো না।

কুয়াকাটা প্রেসক্লাব সভাপতি নাসির উদ্দীন বিপ্লব যদিও রাখাইন আদিবাসীদের জায়গা দখল করে প্রেসক্লাব নির্মাণ না করার কথা নাগরিক প্রতিনিধি দলকে বলেছিলেন কিন্তু স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদ্য যোগদানকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন ওয়ালিদ আইপিনিউজকে বলেন, প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে উক্ত জায়গাটি লীজ নিয়ে আমাদের কাছে টাকা জমা দিয়েছে। আমি সমস্ত বিষয়ে এখনো জানিনা। তবে আমি বুঝিনা যে, আমার পূববর্তী অফিসার কীভাবে এই বিরোধপূর্ণ জায়গায় লীজ দেয়।
তিনি আরো বলেন, এসব বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো ধরণের নতুন চুক্তিতে যাচ্ছি না। সেটা এখন যেভাবে আছে, সেভাবে থাক।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অল্প কিছু রাখাইন পটুয়াখালী অঞ্চলে টিকে আছেন। এখনো নানা প্রভাবশালী মহল রাখাইন আদিবাসীদের বিহার, শশ্মান, পুরাতন স্থাপনা এমনকি ভিটেমাটিও হারাচ্ছেন তারা। এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের দিকে আঙ্গুল তুলে বিহার পরিচালনা কমিটি’র কোষাধ্যক্ষ ও রাখাইন মহিলা মার্কেট সমিতির সভানেত্রী লু মা রাখাইন আইপিনিউজকে বলেন, ‘এই সাংবাদিকরা আমাদের বিহারের জায়গা দখলে নিতে লীজ নিয়েছে। তারা আমাদের পাশে থাকার কথা। কিন্তু তারাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।’ সরেজমিন পরিদর্শনের সময় এ বিষয়ে লু মা রাখাইন এর সাথে কুয়াকাটা টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম এর সভাপতি ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন আনু’র সাথে বাক বিতন্ডাও হয়।
সরেজমিন পরিদর্শনের সময় পরিদর্শক দলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। তারা সবসময় অন্যায়ের বিপক্ষে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং সংখ্যালঘু নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়েছে। কিন্তু এখানে স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে যে, রাখাইন আদিবাসীদের পুরাতন বৌদ্ধ বিহারের জায়গা দখলে নিতে সাংবাদিকদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি স্থানীয় সাংবাদিক নেতাদের এই ঘৃন্য কাজের অংশীজন না হতে অনুরোধ করেন।
তিনি আরো বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড হওয়ার আগেও এই অঞ্চলে রাখাইন আদিবাসীরা ছিল। কাজেই এই আদিবাসীদের উচ্ছেদ করাটা মোটেও শুভকর কিছু নয়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে রাখাইন আদিবাসীরা পটুয়াখালী অঞ্চলে সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাশুন্য হয়ে যাবে।


