আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষক নিয়োগসহ সকল আদিবাসী ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক উদযাপন কমিটি, বাংলাদেশ এর আয়োজনে উক্ত কমিটির ফেসবুক গ্রুপে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮:৩০টায় “বহুভাষিক শিক্ষা আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি স্তম্ভ’ শীর্ষক একটি ভার্চুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ এর প্রতিপাদ্যের সাথে মিল রেখে বাংলায় ‘বহুভাষিক শিক্ষা আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি স্তম্ভ’ বিষয়টির ওপর আলোচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক উদযাপন কমিটি, বাংলাদেশের আহ্বায়ক কবি এ কে শেরাম এবং সঞ্চালনা করেন সোহেল হাজং।
সোহেল হাজং তার উপস্থাপনাকালে বলেন আন্তঃপ্রজন্মের শিশু ও যুবদের জন্য বহুভাষায় শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব রয়েছে। মাতৃভাষার গুরুত্ব দিয়ে সে ভাষায় অন্তত প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। তিনি বিলীয়মান আদিবাসীদের মাতৃভাষা সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ থাকা উচিত বলেও মনে করেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশকে (২০২২-২০৩২) এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত সময় বলেন তিনি।
আলোচনা করেন দেশের আদিবাসী লেখক, কবি ও ভাষা গবেষকগণ- যাদের মধ্যে ছিলেন মণিপুরী ও বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও গবেষক এ কে শেরাম, গারো জাতিসত্তার বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক বাঁধন আরেং, বিশিষ্ট গবেষক ও জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, মণিপুরী জাতিসত্তার লেখক ও গবেষক হামোম প্রমোদ, সাদরি ভাষার লেখক ও গবেষক যোগেন্দ্রনাথ সরকার, ওঁরাও জাতিসত্তার কবি ও লেখক এবং আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক উদযাপন কমিটি, বাংলাদেশ এর সদস্য সচিব স্বপন এক্কা ও কোচ আদিবাসী জাতিসত্তার প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মিঠুন কুমার কোচ।
উক্ত আলোচনার সভাপতি কবি এ কে শেরাম তার সূচনা বক্তব্যে বলেন, সরকার আদিবাসীদের পাঁচটি মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সাল থেকে আদিবাসীদের পাঁচটি মাতৃভাষা নির্বাচন করে পাঁচটি ভাষার পুস্তক প্রনয়ণ করে পাঠদানের কার্যক্রম শুরু করেছে, যদিও এটি এখনো ব্যাপকভাবে ফলপ্রসূ হয়নি। তথাপি এটিকে একটি মহৎ উদ্যোগ বলে অভিহিত করেন তিনি এবং সরকার অচিরেই বাকি আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাক প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি আদিবাসী শব্দের নিহিতার্থ ও প্রয়োগ নিয়েও আরও আলোচনা করা দরকার বলে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক উদযাপন কমিটি, বাংলাদেশের সদস্য সচিব স্বপন এক্কা তার বক্তব্যে উত্তরবঙ্গের ভাষা পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, উত্তরবঙ্গে আদিবাসীদের ভাষা নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কাজ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আদিবাসীদের ভাষাগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলেন ।
গবেষক ও লেখক বাঁধন আরেং তার বক্তব্যে মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার সর্বোত্তম মাধ্যম হচ্ছে মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় যদি শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তা আরও বেশী সুদৃঢ় ও মজবুত কাঠামোতে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষক নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দুইটি এল যথা- ল্যাঙ্গুয়েজ (ভাষা) এবং ল্যান্ড (ভূমি) নিয়ে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন।
গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা ১৪ টি বিপন্ন মাতৃভাষার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন পৃথিবীর বিপন্ন ভাষাগুলোর সবগুলোই আদিবাসীদের ভাষা। তিনি বাংলাদেশের বিপন্ন রেংমিটচা, খাড়িয়া ভাষা রক্ষার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন। তিনি বিপন্ন ভীল জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে সেই ভাষার সংস্কৃতি ও সাহিত্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। তাই যেকোনো ভাষা রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কোচ আদিবাসী জাতিসত্ত্বার তরুণ প্রতিনিধি মিঠুন কুমার কোচ, কোচ ভাষার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অপ্রতুলতার পাশাপাশি কোচ ভাষার বিভিন্ন উপভাষা চর্চার ক্ষেত্রে বহুমুখী সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় সম্পর্কে আলোচনা করেন। মণিপুরী ভাষার গবেষক ও লেখক কানাডা প্রবাসী হামোদ প্রমোদ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, যথাযথ পরিচর্যা করা হলে আর কোনো ভাষা হারিয়ে যাবে না। ভাষা নিয়ে কাজ করে যেমন এসআইএল, এন্ডেঞ্জার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ফাউন্ডেশন বা এ জাতীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে ভাষা রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর আলোকপাত করেন তিনি।
সাদরি ভাষার লেখক ও গবেষক যোগেন্দ্রনাথ সরকার তা বক্তব্যে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার সম্পর্কে বলেন, যেসব এলাকায় আদিবাসী আছে, সেখানে সেই আদিবাসীদের ভাষা শেখানোর জন্য সেই ভাষার আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক উদযাপন কমিটির গঠনের মাধ্যমে ভাষা নিয়ে কাজ করার একটি উপলক্ষ পেয়েছি। তার মতে, আমাদের আদিবাসীবান্ধব লেখক ও গবেষকদের সাথে আদিবাসীদের আরও যোগসূত্র সৃষ্টি করতে হবে।


