আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ভূমি অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান

আইপিনিউজ বিডি, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকাঃ আজ (৬ আগস্ট) সকাল ১০:৩০ মিনিটে ঢাকাস্থ সিরডাপ মিলনায়তনে এএলআরডি ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামসহ জাতীয় পর্যায়ের ১৭টি অধিকারভিত্তিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ‘‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সংস্কৃতির সম্মান” শীর্ষক একটি জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে জাতীয় সংসদের সম্মানিত সদস্য আন্না মিনজ এমপি ও অ্যাড. মাধবী মারমা এমপি সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেমিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, গবেষক ও নৃ-বিজ্ঞানী ড. ঈশিতা দস্তিদার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ডা: ফওজিয়া মোসলেম। এছাড়াও সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নেতা-নেত্রী এবং অন্যান্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কারবারি, হেডম্যান ও রাজা প্রথা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, পরিচয় ও সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই প্রথাগত নেতৃত্ব ব্যবস্থা সংরক্ষণের পাশাপাশি সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রথাগত নেতাদের আরও দক্ষ, শিক্ষিত ও সচেতন হয়ে দায়িত্ব পালন করা জরুরি।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় হেডম্যানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে জমি হস্তান্তর বা প্রথাগত মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে হেডম্যানের প্রত্যয়নপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তির পক্ষে প্রত্যয়ন দেওয়ার মতো অনিয়ম ভূমি বিরোধকে জটিল করে তোলে। এ ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
জুম চাষ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা। কেবল জুম চাষের কারণেই বন উজাড় হয় এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং জুম চাষের টেকসই উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং জুমনির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।
মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে মাধবী মারমা বলেন, শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা ও বোধগম্যতার ভিত্তি গড়ে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে। মাতৃভাষা হারিয়ে গেলে একটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশও বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তাই পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব পর্যায়ে মাতৃভাষার চর্চা ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, আদিবাসী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য দাবি আদায়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সুযোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, বঞ্চনা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ইতিবাচক উদ্যোগ ও উন্নয়নমূলক সুযোগগুলোরও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অধিকার, শিক্ষা, ভূমি, জীবিকা ও টেকসই উন্নয়নের মতো মৌলিক ইস্যুতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
সেমিনারে আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় আট দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে (UNPFII) সরকারীভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে, তাই সরকারীভাবে এ দিবসটি পালন করা হোক।
২. সংবিধানের ২৩ক ধারায় বর্ণিত “উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী” শব্দগুলো বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে Indigenous People যথোপযুক্ত বাংলা শব্দ যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য তা যুক্ত করা।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে এবং এর সভা নিয়মিত সম্পন্ন
করে কমিশনকে গতিশীল করা।
৪. সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
৫. আদিবাসীদের অধিকার দেখভালের জন্য জাতীয়ভাবে একটি সেল গঠন করা যেটি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য গঠিত হবে এবং এই সেলটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অন্তর্ভুক্ত থেকে কাজ যাতে করতে পারে তা নিশ্চিত করা।
৬. আদিবাসী এলাকায় পর্যটন শিল্প প্রসারিত করার আগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা যাতে ব্যাহত না হয় এবং তাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টির প্রতি সম্মান রেখে ভ্রমণের জন্য সরকারীভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে এ নীতিমালা কঠোরভাবে পালন করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৭. কোটা ব্যবস্থার যথাযথ বাস্তবায়ন করা। আদিবাসীদের কোটা ৫% এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য আরো ৩% কোটা কার্যকর করতে হবে।
৮. সরকার ঘোষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীদের নিয়োগ প্রদান করা এবং ধাত্রীবিদ্যার সাথে যুক্ত যে সকল আদিবাসী নারী আছে তাদের তালিকা প্রণয়ন করে সরকারি ব্যয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


