এম এন লারমার ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রাঙ্গামাটিতে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ৬ নভেম্বর ২০২৬, রাঙ্গামাটিঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির উদ্যোগে ১০ই নভেম্বর’৮৩ স্মরণে ‘মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টায় রাঙ্গামাটির কল্যাণপুরস্থ উদ্যোগ রিসোর্স সেন্টারে জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় এম এন লারমার জীবন ও সংগ্রাম শীর্ষক’ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও স্বাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির কান্তি চাকমা, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্ক এর সহসভাপতি এ্যাড. ভবতোষ দেওয়ান, পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি সুমন চাকমা, এইচডব্লিউএফ রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এলি চাকমা প্রমুখ। পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সভাপতি মনি চাকমার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রিনা চাকমা।
স্মরণসভার শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এযাবৎকালে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
এই সময় জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, এম. এন. লারমার জীবন ও সংগ্রামকে কোনো সংক্ষিপ্ত আলোচনায় পূর্ণাঙ্গভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং মৃত্যুর পেছনের ঘটনা প্রবাহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে প্রতিটি জুম্ম পরিবারে তাঁর আদর্শ ও চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর প্রতিক্রিয়াশীল ও কুচক্রী মহল মহান নেতা এম. এন. লারমাকে শারীরিকভাবে হত্যা করলেও তাঁর চেতনা ও আদর্শকে ধ্বংস করতে পারেনি। যারা সেদিন তাঁকে হত্যা করেছিল, সেই একই চিন্তাধারার ধারক-বাহক ও লালনকারী গোষ্ঠী আজও আমাদের সমাজে সক্রিয় রয়েছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে জুম্ম জাতির মুক্তির সনদ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ নিয়ে তারা নানা ধরনের অপব্যাখ্যা ছড়াচ্ছে এবং জুম্ম সমাজের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যুগে যুগে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বিজাতীয় শাসন ও শোষণের শিকার হয়ে আসছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এখানকার জুম্ম জনগণের ওপর অন্যায়, অত্যাচার ও নির্যাতন কমেনি; বরং শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জাতির অস্তিত্ব বিলীন করার বহুমুখী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলেই মূলত আশির দশকের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে একদিকে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত সমাজব্যবস্থা এবং অন্যদিকে আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। এই বাস্তবতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও আমাদের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ আত্মকেন্দ্রিকতায় নিমগ্ন। এই সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব পরিস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। এম. এন. লারমার আদর্শকে পাথেয় করে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে এবং এই লড়াইয়ে নারীদেরও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সবমিলিয়ে, বর্তমানের এই ক্রান্তিলগ্নে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে সর্বক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে সাহসিকতার সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে সামিল হতে হবে।
সাধুরাম ত্রিপুরা বলেন, ১০ই নভেম্বর জুম্ম জাতির ইতিহাসে একটি শোকাবহ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৮৩ সালে কুচক্রী মহলের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন জুম্ম জাতির জনক, পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা-যাঁর নাম ও সংগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের ধ্বংসাত্মক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে শুরু করে ঘুমে আচ্ছন্ন ও পশ্চাৎপদ সামন্তীয় সমাজব্যবস্থা ভেঙে শিক্ষিত তরুণ সমাজকে সংগঠিত করা পর্যন্ত-তাঁর প্রতিটি চিন্তা ও দর্শন সমগ্র জুম্ম জনগণের স্বার্থে নিবেদিত ছিল। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার ১৪টি জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’।
তিনি আরও বলেন, আজকের এই সংকটময় সময়ে এম এন লারমার প্রদর্শিত পথে ছাত্র ও যুবসমাজকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজে এখনো যে পশ্চাৎপদ ও সামন্তীয় চিন্তাধারা বিরাজমান, তা পরিবর্তনের জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যখনই সমাজে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও বৈষম্য জেঁকে বসে, তখনই সাম্রাজ্যবাদী ও শোষকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ‘ভাগ কর, শাসন কর’ নীতি কার্যকর করার সুযোগ পায়। এই শৃঙ্খল ভেঙে সমাজ পরিবর্তনে এক নতুন প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আরও পরিশ্রমী ও সচেতন হতে হবে। নিজেদের জন্মভূমি, সংস্কৃতি এবং অধিকারের সঠিক মূল্যায়ন করার মাধ্যমেই কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
শিশির কান্তি চাকমা বলেন, ১০ই নভেম্বর জুম্ম জাতীয় জীবনের একটি শোকাবহ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। কুচক্রী মহলের হাতে নিহত জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রামের অনন্য প্রতীক, পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত ও দূরদর্শী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছাত্রজীবন থেকেই নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। কাপ্তাই বাঁধের কারণে জুম্মদের ভূমি তলিয়ে যাওয়া ও উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কায় তিনি ছাত্রাবস্থাতেই প্রতিবাদ গড়ে তুলে কারাবরণ করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর রাজনৈতিক অসচেতনতা ও নেতৃত্বের সংকটের সময়ে তিনি ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তি স্থাপন করেন। জাতীয় সংসদে জুম্ম জনগণকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে তাঁর সংসদ বর্জন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান তাঁর নেতৃত্বকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। এম এন লারমার আদর্শ অধ্যয়ন করে বর্তমান তরুণ সমাজকে আজ জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে।
এ্যাড. ভবতোষ দেওয়ান বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে নিপীড়িত মানুষের অধিকার, নারী-পুরুষ সমতা এবং শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক অধিকার যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সে সময় গণপরিষদে দাঁড়িয়ে এম এন লারমা এই অসংগতির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি আজীবন শোষণের বিরুদ্ধে এবং অধিকারহারা সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়ে গেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পূর্ণাঙ্গভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূলস্রোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক দলগুলো আজও সেই সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। নির্বাচনের আগে মুখে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।
সুমন চাকমা বলেন, আজকের দিনটি জুম্ম জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন দূরদর্শী ও আপসহীন সংগ্রামী। কাপ্তাই বাঁধের ফলে যখন জুম্ম জনগণের ৫৪ হাজার একরের ভূমি তলিয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়, তখন ছাত্র অবস্থাতেই তিনি এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। সে সময় ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও জুম্ম জনগণ তার কোনো সুফল পায়নি। এই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর অপরাধে পাকিস্তান সরকার তাঁকে দুই বছর কারাবন্দী রাখে। এম এন লারমা একাধারে শিক্ষক, আইনজীবী ও সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা না ভেবে নিজের জীবন জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ে উৎসর্গ করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি জুম্ম জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। তৎকালীন সময়ে জুম্ম জনগণকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে তিনি সংসদ বর্জন করেছিলেন। তাঁর এই সংগ্রাম কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সারা দেশের মেহনতী মানুষের অধিকারের পক্ষে। প্রতিটি ছাত্র ও যুব সমাজের মাঝে মহান নেতা এম এন লারমার আদর্শ, জীবন ও দর্শন সম্পর্কে ধারনা থাকা প্রয়োজন।
এলি চাকমা বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ও দর্শন জুম্ম সমাজের প্রতিটি ঘরে ও চেতনায় ধারণ করা প্রয়োজন। একসময়ের স্বাধীন জুম্ম জাতির অধিকার ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে একে একে বিলীন করা হতে থাকে। তখন রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্বের তীব্র অভাব ছিল, যা প্রথম উপলব্ধি করিয়েছিলেন এম এন লারমা। পশ্চাৎপদ সমাজ ব্যবস্থায় তিনি শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি জুম্ম সমাজকে লড়াই-সংগ্রামে উজ্জীবিত করেন। জাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দীর্ঘ দুই দশক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ ধরে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটির পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই; বরং শাসকগোষ্ঠী চুক্তি লঙ্ঘন করে নানা ষড়যন্ত্র জিইয়ে রেখেছে।


