পিসিপি বান্দরবান শহর শাখার ১ম সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, বান্দরবানঃ “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হউন” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৭ অক্টোবর ২০২৬, রোজ শনিবার বান্দরবান শহরস্থ মাস্টার গেস্ট হাউজে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বান্দরবান শহর শাখার ১ম সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত সম্মেলন ও কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির ছাত্র বিষয়ক সহ সম্পাদক শ্রী থোয়ইক্যজাই চাক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য কাননমালা তঞ্চঙ্গ্যা, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য প্রিয় জ্যোতি চাকমা (রিবেক), পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উশৈহ্লা মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, বান্দরবান জেলা কমিটির সদস্য মেসাই মারমা প্রমুখ।
সম্মেলন ও কাউন্সিলে পিসিপি বান্দরবান শহর শাখা কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক উবাথোয়ই মারমার সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব ফিলিপ খিয়াং-এর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্য রংথইন ম্রো।
সম্মেলনের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এযাবৎকালে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথি শ্রী থোয়াইক্য জাই চাক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ যুগ যুগ ধরে বিজাতীয় শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম করে আসছে। লড়াই সংগ্রামের এই গৌরবময় পথচলায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহাসিক গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এই পিসিপিকেই হতে হবে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সেনানী।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের এক পর্যায়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। এই চুক্তি ভিন্ন ভাষাভাষী ১৪ জনগোষ্ঠীর জুম্ম জনগণের অধিকারের দলিল। এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ব্যহত করতে সরকার, জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ও চুক্তি বিরোধী গোষ্ঠী নানা ধরনের অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। জুম্ম জনগণকে জাতিগত বিভাজন, রাজনৈতিক বিভাজনের ফাঁদে ফেলে শাসন শোষণ জিইয়ে রাখছে। যারা জাতিগত বিভাজনের কথা বলে বিদ্বেষ ছড়ায়, চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলে, রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিরুৎসাহিত করে তারা জুম্ম জনগণের অধিকারের বিপক্ষে। কাজেই তরুণ প্রজন্মকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে এবং অধিকারের জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে।
কাননমালা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতা অতীতের মতো সংকটে আচ্ছন্ন। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পুরুষদের পাশাপাশি নারী সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। পশ্চাৎপদ জুম্ম জাতির পশ্চাৎপদ নারী সমাজকে জাগ্রত করতে আমাদের সকলকে কাজ করতে হবে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত সংগ্রামী শক্তিই জুম্ম জনগণের অধিকারের আন্দোলনকে বেগবান করবে।
রিবেক চাকমা বলেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলায় প্রতিনিয়ত ভূমি দখল, পর্যটনের নামে জুম্মদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ, জুম্ম নারী ধর্ষন, ইসলামীকরণসহ জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে মুছে দেয়ার জন্য নানা ধরনের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র চলমান রয়েছে। এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে হবে। জাতি বৈচিত্র্যের এই বান্দরবানে শাসকগোষ্ঠী ও কতিপয় বিপথগামী গোষ্ঠী জাতি ও সমাজের উন্নতির নামে প্রতিনিয়ত জাতিগত বিভাজনসহ নানাভবে জুম্ম জনগণ ও ছাত্র সমাজকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর কারাগার থেকে মুক্তির জন্য আমাদের পরস্পরের সহযোগী ও সহযোদ্ধা হতেই হবে।
তিনি আরও বলেন, সংকীর্ণ জাতীয়বাদ স্বীয় জাতিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্য জাতিকে ছোট করে, অবহেলা করে আর উগ্র জাতীয়তাবাদ স্বীয় জাতির স্বার্থে অন্য জাতিকে অস্বীকার করে আগ্রাসন,দমন,ঘৃণা, বিদ্বেষ লালন করতে শেখায়। জুম্ম জাতীয়তাবাদ সেই সংকীর্ণতা ও উগ্রতা পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগোষ্ঠীর ছাত্র সমাজকে তাই প্রতিক্রিয়াশীল সংকীর্ণ ও উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তা পরিহার করে প্রগতিশীল জুম্ম জাতীয়তাবাদের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে সমবেত হতে হবে।
উশৈহ্লা মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার হারা মানুষের কথা বলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করা এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্র সমাজকে সাথে নিয়ে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় সেই সংগ্রামের ইতিহাস, জুম্ম জাতির ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতাকে জানতে হবে অনুধাবন করতে হবে এবং করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
মেসাই মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য নারী সমাজকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নারী-পুরুষ সমধিকার, সমমর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে এ আন্দোলনের গতিকে আরো বেগবান করা উচিত বলে মনে করি। তাই নারী সমাজকেও সর্বোচ্চ ত্যাগ করে মুক্তির মিছিলে সমাবেত হবার মানসিকতা নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে।
কাউন্সিল অধিবেশনে উবাথোয়ই মারমাকে সভাপতি, জেহিস্কেল ত্রিপুরাকে সাধারণ সম্পাদক ও চনুমং মারমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে পিসিপি বান্দরবান শহর শাখার ১ম কমিটি গঠন করা হয়। নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এডিসন চাকমা। পরবর্তীতে উবাথোয়ই মারমার সমাপণী বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।


