জাতীয়

পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি বাতিলের দাবিতে রাজধানীতে গণসংযোগ

আইপি নিউজ ডেস্কঃ পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি বাতিলের দাবিতে রাজধানীতে গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ছাত্র ও যুব সংগঠনসমূহ। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর পুরান পল্টন মোড়ে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে পল্টন মোড় থেকে বিজয়নগর হয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন নয়াপল্টন পর্যন্ত গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপক শীলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)-এর সভাপতি গৌতম শীল, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এ সময় নেতাকর্মীরা পথচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরেন।

সমাবেশে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলমান শোষণ ও বঞ্চনার অবসানের প্রত্যাশা থাকলেও বর্তমানে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধাত্নক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা চুক্তির চেতনার পরিপন্থী। সরকারের এসব কার্যকলাপের নিন্দা জানিয়ে তিনি দ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।

সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অবিলম্বে চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

কর্মসূচিতে বিতরণ করা প্রচারপত্রে বলা হয়, পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় চুক্তি অনুযায়ী যেভাবে গঠন করে পরিচালনা করবার কথা ছিল সেভাবে করা হচ্ছে না। বিশেষ করে চুক্তিকে লংঘন করে মন্ত্রণালয়ে অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রী নিযুক্তিতে পাহাড়ের জনসাধারণ প্রতিবাদ জানালেও তাকে এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। বরং সামরিক কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া চলমান রাখা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ কর্তৃক তিনটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি সমূহের মধ্যে উপরোক্ত দু’টি কমিটিকে সচিবালয় সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) কর্তৃক প্রদান করার কথাও বলা হয়েছে।

প্রচারপত্রে আরো বলা হয় যে, অতীতের সরকারসমূহ সামরিক ও বেসামরিক আমলা কর্তৃত্বের মধ্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে শাসন করার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ইতিবাচক পরিবর্তন না হয়ে বরং সংঘাত, রক্তপাত, বিভেদ এবং বিদ্বেষ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংঘাত ও বিভেদ থেকে সরে এসে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্র বিক্ষুব্ধ পাহাড়ী জনগণের সাথে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০২৬ সালে এসেও সামরিক ও বেসমারিক আমলা কর্তৃত্বের প্রেসক্রিপশনে পার্বত্য অঞ্চল শাসন করার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা উল্টো পথে যাত্রারই সামিল।

এই প্রেক্ষাপটে সংগঠনসমূহ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে রাজনৈতিক উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করেন-

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি কমিটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে;
২. পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে;
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করতে হবে;
৪. চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ প্রদানের জন্য উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করতে হবে;
৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ভিত্তিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে;
৬. বিধিমালা প্রণয়ণসহ দ্রুততম সময়ে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে হবে;
৭. অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ আয়োজন করতে হবে;
৮. পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যাসহ সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ শুরু করতে হবে।

Back to top button