জাতীয়বিশেষ প্রতিবেদন

আদিবাসী পরিচয় নিয়ে সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদে যৌথ বিবৃতি

আইপিনিউজ বিডি, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকাঃ গত ১১ আগস্ট (মঙ্গলবার) ২০২৬, ঢাকার একটি হোটেলে চিটাগং হিল ট্র‍্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ ‘আদিবাসী’ নয়; সাংবিধানিকভাবে সকলের পরিচয় একটাই ‘বাংলাদেশী’। ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখন্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই মূল পরিচয়-আমরা সবাই ‘বাংলাদেশী’। এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই; আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’।” এছাড়াও বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক।” মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যে এও বলেছেন যে, “২০০৭ সালে জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার সময় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল এবং আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র ও আইএলও ১৬৯ এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাধ্যতামূলক নয় এবং বাংলাদেশ এসবের অংশীদারও নয়।”

“বাংলাদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্ব না থাকার” বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রীর এমন আপত্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্যকে আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি এবং তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা নিম্ন স্বাক্ষরকারী আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহ পুন:র্বার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির জাতিবৈচিত্র্যের দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জাতির পাশাপাশি পঞ্চাশের অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্মরণাতীত কাল থেকে স্বকীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-প্রথা ও জীবনধারা নিয়ে বসবাস করছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামে আদিবাসীদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহন থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরবর্তীতে যতগুলো সরকার শাসনক্ষমতায় এসেছে প্রত্যেক সরকারই আদিবাসীদের নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে। যার দরুণ বর্তমান সময়ে এসে আদিবাসীরা আজ জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্তির সম্মুখীন ও সংকটাপন্ন। আদিবাসীদের জাতীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নিমিত্তে যেখানে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রয়োজন সেখানে সরকারসমূহের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এহেন বক্তব্য আদিবাসীদেরকে ক্রমাগত প্রান্তিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আমরা আবারও বলতে চাই যে, ২০০৭ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের প্রতিপালন ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের প্রত্যেকটি সদস্য রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য। এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ণের সময় বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকলেও জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে প্রত্যেকটি ঘোষণাপত্র মেনে চলা এবং বাস্তবায়ন করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। ২০০৭ সালে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ণে বিরোধীতা করে ভোট দিয়েছিল অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরে এই ঘোষণাপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় তাঁদের স্বকীয় সংস্কৃতি, ভূমি ও মানবাধিকার ত্বরান্বিত করার জন্য পরবর্তীতে ২০০৯ সালে অষ্ট্রেলিয়া, ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৬ সালে কানাডা এই ঘোষাণাপত্রে অনুস্বাক্ষর করে। এসব ঘটনা সমূহকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ধর্তব্যে নিয়ে বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হতে পারত, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যা এখনও হয়ে ওঠেনি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মাননীয় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উক্ত বৈঠকে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বিশেষ সুযোগ দিয়ে জাতীয় জীবনে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার কথা বলেছেন। আমরা মনে করি এই চিন্তার মধ্যে রয়েছে আদিবাসীদের স্বকীয় স্বত্ত্বা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, জীবনাচরণ ও বিশ্বাসকে নিজেদের মত করে বিকশিত করার রাষ্ট্রীয় সুযোগ তৈরীর বদৌলতে তথাকথিত মূলধারার বাঙালি জাতিসত্ত্বার সাথে একীভূতকরণের ইঙ্গিত- যা বিএনপি প্রণীত ৩১ দফার রেইনবো-নেইশন গঠনের প্রতিশ্রুতির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।

আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ সরকার এ ধরণের একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরাপত্তার লেন্স দিয়ে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি থেকে সরে আসবে। একইসাথে ন্যায় ও সমতাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণে আদিবাসী জাতিসমূহকেও জাতিগতভাবে এবং আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে তাঁদের ভ‚মি, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক মানবাধিকার উন্নতিতে মনোযোগী হবে।

আমরা নিম্ন স্বাক্ষরকারী আদিবাসী ছাত্র ও যুব সংগঠন সমূহ পুনর্বার দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করতে চাই যে, আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টিকে আমরা একটি আপসহীন ও বিতর্কমুক্ত বিষয় হিসেবে দেখতে চাই।

এ লক্ষ্যে আমাদের সুস্পষ্ট দাবিসমূহ হলো:
১. বাংলাদেশের আদিবাসীদেরকে আদিবাসী হিসেবেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ তাঁদের ভূমি, ভূখন্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র-২০০৭ বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরদানকারী সংগঠনসমূহ হলঃ-
১. বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস্ কাউন্সিল ২. ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, বাংলাদেশ ৩. বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম ৪. বম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন ৫. বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন ৬. বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন ৭. বাংলাদেশ খেয়াং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ৮. বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন( বাগাছাস) ৯. বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশন (জিএসএফ ১০. বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন (বাহাছাস) ১১. বাংলাদেশ মাহাতো আদিবাসী ছাত্র সংগঠন) ১২. হাজং স্টুডেন্ট কাউন্সিল (হাসুক) ১৩. বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (গাসু) ১৪. খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ১৫. হিল উইমেন্স ফেডারেশন ১৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ১৭. বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৮. বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম ১৯. বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ২০. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ ২১. আরফি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবার ২৩. ইন্ডিজিনাস স্টুডেস্টস ইউনিয়ন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ২৪. ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন, জাবি ২৫. এসোশিয়েশন অফ ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস, সাস্ট

Back to top button