বাংলাদেশে আদিবাসী পরিচয় অস্বীকারের প্রতিবাদে CHTC ও IWGIA’র যৌথ বিবৃতি

আইপিনিউজ বিডি, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, আন্তর্জাতিকঃ ঢাকায় ১১ আগস্টের এক গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও পরিচয় অস্বীকার করে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন (CHTC) ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (IWGIA)।
১৩ আগস্ট প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যকে উদ্বেগজনক ও ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই এবং সবাইকে শুধু বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিত হওয়ার কথা বলেছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
একইসঙ্গে তিনি জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক ঘোষণা (UNDRIP) ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক বলে দাবি করেছেন বলে জানায় CHTC ও IWGIA।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; আদিবাসী জনগণ একইসঙ্গে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর সদস্য।
জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুমোদন না করলেও ১৯৫৭ সালের আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুমোদন করেছে, যা এখনো বাংলাদেশের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকৃত এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন আইন, নীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পরিচয়ের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হলে এ অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে।
আদিবাসী অধিকার নিয়ে আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতাও CHTC ও IWGIA উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে। তারা সরকারের প্রতি আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয়ের অধিকারকে সম্মান, বৈষম্যমূলক বক্তব্য প্রত্যাহার এবং আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে।
একইসঙ্গে আইএলও কনভেনশন ১০৭ বাস্তবায়ন, কনভেনশন ১৬৯ অনুমোদন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সময়বদ্ধ রোডম্যাপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি বাংলাদেশের ঐক্য বা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে না; বরং স্বীকৃতি, সমতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানই একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।
CHTC ও IWGIA বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—
১। বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের অস্তিত্ব ও পরিচয় অস্বীকার করে মন্ত্রীদের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার অথবা ব্যাখ্যা করতে হবে।
২। আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অধিকারকে সম্মান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী যেসব পরিভাষাকে অবমাননাকর মনে করে এবং ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেসব পরিভাষা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩। সরকারি কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে “Indigenous Peoples” বা “Adibashi” শব্দ ব্যবহার না করার জন্য নির্দেশনা বা চাপ প্রয়োগ করা যাবে না।
৪। শান্তিপূর্ণ আদিবাসী অধিকার আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী, ষড়যন্ত্রমূলক কিংবা জাতীয় ঐক্য বা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার বক্তব্য বন্ধ করতে হবে।
৫। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসী জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, নারী, যুব ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ শুরু করতে হবে।
৬। আইএলও কনভেনশন ১০৭ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ সরকারের বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন, UNDRIP বাস্তবায়ন এবং আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুস্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে হবে। এবং
৭। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে কার্যকর ও পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সামরিকীকরণ বন্ধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


