মতামত ও বিশ্লেষণ

একজন শিক্ষিকা, একটি অনাগত প্রাণ, দুটি মৃত্যু- দায় কার? – বেবিলন চাকমা

গতকাল রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে ঘটে গেছে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। বিজিবির একটি ডাম্পার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গর্ভবতী শিক্ষিকা সুমন্তী চাকমা (৩০)। সন্তান প্রসবের জন্য স্থানীয় সিএনজি চালক হরেন্দ্র ত্রিপুরার সঙ্গে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নন্দারাম ও এগোজ্যাছড়ি গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে আসা একটি বিজিবির ডাম্পার তাঁদের বহনকারী সিএনজিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সুমন্তী চাকমা। তাঁর সঙ্গে নিভে যায় পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাঁর গর্ভের অনাগত শিশুর জীবনও। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। চিতায় আগুন দেওয়ার আগে মৃত সুমন্তী চাকমার গর্ভের শিশুটিকে সবার সামনে দেখানো হচ্ছিল। এমন দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র মানবতার বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এখন প্রশ্ন হলো- এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক। সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি যদি এমনভাবে চলাচল করে যে তার ধাক্কায় একজন গর্ভবতী নারী ও তাঁর অনাগত সন্তান প্রাণ হারান, তবে এটিকে কেবল “দুর্ঘটনা” বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, চালকের গতি কত ছিল, প্রয়োজনীয় সতর্কতা মানা হয়েছিল কি না এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া জরুরি।

দুঃখজনকভাবে, জাতীয় গণমাধ্যমগুলো ঘটনাটিকে কেবল একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই উপস্থাপন করেছে। অধিকাংশ সংবাদে ঘটনাটি শুধু “সড়ক দুর্ঘটনা” হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যানবাহন জড়িত থাকে এবং একজন গর্ভবতী শিক্ষিকা ও তাঁর অনাগত সন্তান প্রাণ হারান, তখন সাংবাদিকতার দায়িত্ব কেবল দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ করেই শেষ হয়ে যায় না। গণমাধ্যমের উচিত ছিল ঘটনার প্রেক্ষাপট, দুর্ঘটনার কারণ, চালকের দায়িত্বশীলতা, নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এসব বিষয়ও অনুসন্ধান করা।

কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে এটি শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয় এটি নিরাপত্তা, দায়িত্বশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন। যখন একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গাড়ি জড়িত থাকে, তখন তদন্ত আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া উচিত, যাতে কোনো প্রশ্নের অবকাশ না থাকে।আমরা পাহাড়ে প্রায়ই দেখি বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহন চালানোর প্রবণতা। বিশেষ করে বহিরাগত অনেক চালক পাহাড়ী সড়কের ঝুঁকি না বুঝেই দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান। অথচ এই সড়কগুলো সমতলের মহাসড়ক নয়। এখানে একটি ছোট ভুলও মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিতে পারে নিরীহ মানুষের জীবন। তাই পাহাড়ী এলাকায় গতিনিয়ন্ত্রণ ও কঠোর সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর বিকল্প নয় এটি জরুরি প্রয়োজন।

সুমন্তী চাকমার মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি একজন শিক্ষিকার মৃত্যু, একজন মায়ের মৃত্যু, একটি অনাগত শিশুর মৃত্যু এবং একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্নের মৃত্যু। এই মৃত্যুকে যদি শুধু “দুর্ঘটনা” বলে আড়াল করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক সুমন্তীকে একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা স্বাধীন তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, নিহতের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে পাহাড়ী সড়কে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সব যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যাহাতে সুমন্তী চাকমার মৃত্যু যেন আরেকটি বিস্মৃত ফাইল হয়ে না যায়। সত্য উদঘাটন হোক, দায় নির্ধারণ হোক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।

*বেবিলন চাকমা, আদিবাসী অধিকার কর্মী ও যুগ্ন সম্পাদক, আইপিনিউজ বিডি

Back to top button