
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যকার ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয়বাহিনী ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক জুম্মদের উপর কমপক্ষে ১৩টি গণহত্যা চালানো হয়। বাংলাদেশ সরকার এই গণহত্যাগুলোর একটিরও বিচার এখনও পর্যন্ত করেনি। এমনই এক নৃসংশ গণহত্যা সংঘটিত হয় ১৯৮৪ সালের ৩১ মে’র আজকের এই দিনে যা সেনাবাহিনী ও সেটেলার বাঙালি কর্তৃক সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩০৫তম ব্রিগেড এবং বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)’র ১৭তম ব্যাটালিয়নের সদস্যরা সেটেলার বাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে এ্যাদভরিয়ে, সুগুরিপাদা, গোরস্থান, তারেঙে ঘাট, ভূষণছড়া ও ভূষণবাগ গ্রামগুলোতে একযোগে আক্রমণ চালায়। এতে প্রায় ৪০০ জুম্ম মারা যায়, যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও ছিল। অনেক নারীকে গণধর্ষণের পর গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রায় ৭,০০০ জুম্ম মিজোরাম রাজ্যের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডে ৬৭জন আদিবাসী মৃতের তালিকা পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ২১ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে।’
পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ধ্বংস এবং জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের লক্ষ্যেই সামারিক বাহিনী ও সেটেলার বাঙালিরা পরিকল্পিতভাবে বর্বরোচিত এই গণহত্যা ঘটিয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর প্রতিবেদন: No Chakmas will be born in Bangladesh
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় হাজার হাজার জুম্মদের ভূমিকে বেদখল করে ১৯৮১ সালে প্রায় ৫০০টির অধিক বাঙালি পরিবারকে বরকল উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম যেমন- গোরস্থান, ভূষণছড়া এবং ছোট হরিণা গ্রামে বসতি স্থাপন করানো হয়। স্থানীয় জুম্ম জনগণের তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বে বাঙালিদের পুনর্বাসন করায় এসব এলাকার পরিস্থিতি টমটমে হয়ে উঠে। শান্তিপূর্ণ বরকল উপজেলায় জুম্ম জনগণের উপর সেটেলার বাঙালি ও বিডিআর সদস্যদের ব্যাপক নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়।
৩১ মে ১৯৮৪ সালের ভোরে শান্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা বরকল উপজেলার স্থানীয় তিনটি বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) ক্যাম্পে একযোগে হামলা চালায়। বিডিআর ক্যাম্পের উপর হামলার পরপরই পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩০৫তম ব্রিগেড এবং বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)’র ১৭তম ব্যাটায়িনের সদস্যরা সেটেলার বাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে জুম্ম জনগণের ওপর চালানো প্রতিশোধমূলক হামলা চালায় এবং ভয়াবহতম ভূষণছড়া গণহত্যা সংঘটিত হয়।
এ্যাদভরিয়ে গ্রামের এক চাকমা বাসিন্দা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেন:
“আমার গ্রাম বরকল পুনর্বাসন অঞ্চলের মধ্যে পড়ে, যেখানে বহু মুসলিম বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে। এ কারণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বদা উত্তেজনা বিরাজ করত। ১৯৮৪ সালের গ্রীষ্মে প্রায়শই সংঘর্ষ হতো এবং মুসলিম বাঙালিরা প্রায়ই হুমকি দিত যে, সেনাবাহিনী এসে আমাদের শিক্ষা দেবে। ৩১ মে সেনাবাহিনী এল, সঙ্গে ছিল বহু মুসলিম বাঙালি যাদের মধ্যে কিছু অস্ত্রধারীও ছিল। তারা আমাদের গ্রাম ধ্বংস করে, নারীদের ধর্ষণ করে এবং মানুষ হত্যা করে। আমি নিজ চোখে দুইজন নারীকে ধর্ষণের পর বেয়নেট দিয়ে হত্যা করতে দেখি। আমার এক দূরসম্পর্কের বোন আরতি, তাকেও কয়েকজন সৈনিক ধর্ষণ করে এবং তার শরীর বিকৃত করে বেয়নেট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। শিশুসহ অনেক মানুষকে কুঁড়েঘরের মধ্যে ফেলে পুড়িয়ে মারা হয়। কিছু মানুুষকে প্রকাশ্যে মারা হয়েছিল যার মধ্যে আমিও ছিলাম। আমাদের পাঁচ-ছয়জনকে গাছের ডালে উল্টো করে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়। সম্ভবত আমাকে মৃত ভেবে ফেলে রাখে, তাই বেঁচে যাই। সেই দিনের স্মৃতি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো। এখনো মাঝেমধ্যে ঘুম থেকে ঘাম ভিজে জেগে উঠি, যখন সেই দৃশ্য মনে পড়ে সৈনিকরা আমাদের নারীদের গোপনাঙ্গে বেয়নেট ঢুকাচ্ছে। তারা সবাই চিৎকার করছিল, ‘বাংলাদেশে আর কোনো চাকমা জন্মাবে না (No Chakmas will be born in Bangladesh)।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ৬৭জন মৃতের যে তালিকা পেয়েছিল সেখানে আরতি চাকমার নাম ছিল। তার বিবরণে বলা হয়, ‘তার বয়স ছিল ২২ বছর, বাস করত এ্যাদভরিয়েতে; ধারালো ছুরি দিয়ে তার স্তন দুটি কেটে ফেলা হয়েছিল। ৬৭জনের মধ্যে নারী মৃতদেহ ছিল ১১টি যাদের মধ্যে প্রায় সবাই মৃত্যুবরণ করার ধর্ষিত হয়েছিল।’
সুগুরিপাদা গ্রামে ২৫ জন মৃত মানুষের মধ্যে ১৭জন নারী এবং শিশু ছিল। শিশুদের সবাই ছিল পনের বছর বয়সের নিচে। সুগুরিপাদা গ্রামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী জুম্ম বর্ণনা করেছেন যে, ‘সৈন্যরা গ্রামের অধিকাংশ নারীর স্পর্শকাতর অংশগুলোতে গুলি, বেয়নেট দিয়ে আঘাত করেছিল এবং তাদের অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়েছিল। গ্রামের অনেক মানুষকে তাদের ঘরের সাথে বেঁধে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আমার বন্ধু সনাতকে অনেক আঘাত করেছিল এবং তাকে বারবার শান্তিবাহিনরীর খবর জিজ্ঞাসা করছিল। যখন যে বলেছিল যে সে কিছু জানে না তখনই আরেকজন জুম্মকে গুলির মুখে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। গ্রামে অধিকাংশ মহিলা ছিল ধর্ষিত এবং আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না যে, আমরা কি করে বেঁচে গেলাম। আমি জানিনা কতজন মারা গিয়েছে তবে আমি ৩০ থেকে ৪০টি মৃতদেহ দেখেছিলাম যাদের মাঝে দশজন ছিল ছোট শিশু। অধিকাংশ শিশুকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয়েছিল।’
সুগুরিপাদা গ্রামের মৃতদের মাঝে ছিলেন সনৎ কুমার চাকমা এবং তার ছেলে ভগবান চন্দ্র চাকমা যাদের দু’জনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছিল।’
পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে, অক্ষয় ছেন চাকমা, বয়স ছিল ২৫, বাবা ছিলেন শশী মোহন চাকমা যাকে তার বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আবার নিশি মোহন চাকমার ছেলের সাধনা মোহন চাকমা, যার বয়স ছিল ১৬ বছর, তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল।’
গোরস্থান গ্রামের মৃতের তালিকা ছিল নয়জনের। গোরস্থান গ্রামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করেছেন যে, ‘মে মাসের ৩০ তারিখ এর শেষ রাতের দিকে আমরা ভয়ংকর হট্টগোল শুনতে পেয়েছিলাম এবং ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছিলাম কিন্তু পালিয়ে যারার আগে সেনাবাহিনীর একটি দল আমাদের গ্রামে এসেছিল এবং বাতাসে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আমাদের নড়াচড়া করতে মানা করেছিল। এরপর কি হয়েছিল তা মনে করাটা যথেষ্ট ভয়ংকর, কারণ আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম সেনাবাহিনী ঘরবাড়ির উপর এবং যেসব মানুষ দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে পালাতে শুরু করেছিল তাদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করল। আমার মনে হয়েছিল যে, সব শেষ হয়ে গেল। আমি দেখলাম অধিকাংশ মানুষ দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সবাই বলছিল যে, যারা মারা গিয়েছে তাদের মাঝে সাধনা মোহন এবং অক্ষয় ছিল।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যকাণ্ডের একটিরও বিচার রাষ্ট্রযন্ত্র করেনি বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে এই গণহত্যার হোতাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী গণহত্যাগুলো সংঘটিত হওয়ার পথকে প্রশস্ত করে দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্র এসব গণহত্যা ভূলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পাহাড়ের নিপীড়িত জুম্ম জনগণ কখনও গণহত্যার কথা ভূলেনি এবং গণহত্যার শহীদদের আত্মত্যাগের কথা ভূলে যাবে না। পাহাড়ের নতুন প্রজম্ম শহীদদের আত্মত্যাগকে শিরোধার্য্য করে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অধিকতর সামিল হবে এবং নতুন সূর্যোদয় আনার জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গ করার শপথ নিবে।


