পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার ২৭তম বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ, রাঙ্গামাটি: পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), রাঙ্গামাটি জেলা শাখার ২৭তম বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল- ২০২৬ রাঙ্গামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সম্মেলন ও কাউন্সিলে দুই শতাধিক প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের মূল স্লোগান ছিল- “জুম্ম স্বার্থপরিপন্থী ও চুক্তিবিরোধী সকল প্রকার ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করুন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হোন”।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি সম্মেলন ও কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য গুনেন্দু বিকাশ চাকমা, বিশেষ অতিথি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা, পিসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জিকো চাকমা এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কবিতা চাকমা উপস্থিত ছিলেন।
পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ম্যাগলিন চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন জেলা শাখার বিদায়ী কমিটির সভাপতি সুমন চাকমা।

সম্মেলনের শুরুতে গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীবৃন্দের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রামে শহীদ এবং আহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করার মধ্যে দিয়ে প্রথম অধিবেশনের আলোচনা সভা শুরু হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে গুনেন্দু বিকাশ চাকমা বলেন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং ঐতিহাসিক প্রয়োজন থেকেই এর আত্মপ্রকাশ। লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ হলেও তার পেছনে ছিল পাহাড়ের ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে ছাত্রসমাজ সবসময় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে। তাই নতুন প্রজন্মকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামের ইতিহাস জানতে হবে এবং সেই ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় তরুণ প্রজন্মকে লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ের অনেক ছাত্র-যুবকের জন্ম পার্বত্য চুক্তির পরে। ফলে চুক্তির আগের সশস্ত্র সংগ্রামের বাস্তবতা তাদের কাছে অজানা। জেএসএস কেন জন্ম নিয়েছিল, কেন সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছিল এবং কীভাবে চুক্তিতে উপনীত হওয়া গিয়েছিল, এসব ইতিহাস জানা ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আন্দোলনের ইতিহাস জানলেই ছাত্রসমাজ ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং লড়াই সংগ্রামে অবদান রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চুক্তির মৌলিক চেতনা ও শর্তকে উপেক্ষা করে একজন অ-পাহাড়িকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্পষ্ট নীতিমালা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু চুক্তির মৌলিক চেতনাকেই আঘাত করে না, বরং পাহাড়ের মানুষের ন্যায্য রাজনৈতিক অধিকার ও অংশীদারিত্বের প্রশ্নকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি বলেন, বাস্তবতা যদি এমনই হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই পাহাড়ের জনগণের সামগ্রিক স্বার্থ, আস্থা ও স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক বা কল্যাণকর হতে পারে না।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পিসিপি কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জিকো চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ ২৮ বছর পার হলেও এর মৌলিক ধারাগুলোর বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এই চুক্তির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তাক্ত ইতিহাস। অসংখ্য যোদ্ধার আত্মত্যাগ, নারীসমাজের সীমাহীন নির্যাতন এবং হাজারো মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এই চুক্তি কোনোভাবেই কাগুজে দলিল হয়ে থাকতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ হতাশা, ক্ষোভ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। শাসকগোষ্ঠী এবং একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এর বিপরীতে জুম্ম জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে।
যুব নেতা সুমিত্র চাকমা বলেন, পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি গভীর সংকটময়। ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক অবক্ষয় ও মাদকাসক্তি- সব মিলিয়ে জুম্ম জনগণ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি সম্ভব নয়। তাই জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছাত্রসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কবিতা চাকমা বলেন, জুম্ম ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে পিসিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমান জাতীয় সংকটের সময়ে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রতিনিধি সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদার, বিশেষ অতিথি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মালবিকা দেওয়ান এবং পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা। এ অধিবেশনের শুরুতে পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার এক বছরের সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিদায়ী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সুনীতি বিকাশ চাকমা।
পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার আওতাধীন বিভিন্ন শাখার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থাপিত সাংগঠনিক প্রতিবেদনের উপর প্রস্তাবনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
সম্মেলন ও কাউন্সিলের শেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে পুনরায় সুমন চাকমাকে সভাপতি, ম্যাগলিন চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক এবং সজল চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার নতুন কমিটি গঠন করা হয়। নব নির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা।
পরিশেষে বিদায়ী সভাপতি সুমন চাকমার সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার ২৭তম বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিলের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।


