জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে আদিবাসী ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে চঞ্চনা চাকমার বক্তব্য উপস্থাপন

আইপিনিউজ বিডি: গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) প্রতিনিধি চঞ্চনা চাকমা “আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী ও জলবায়ু পরিবর্তন: আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রের ৩, ৪, ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদ” প্রতিপাদ্যের উপর এজেন্ডা আইটেম ৫(ই): আন্ত:আঞ্চলিক, আন্ত:প্রজন্মগত ও বৈশ্বিক সংলাপ বিষয়ে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনটি শুরু হয়েছে গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে এবং এর সমাপ্তি ঘটবে ১ মে ২০২৬ তারিখে।
পিসিজেএসএসের তিন প্রতিনিধি চঞ্চনা চাকমা, অগাস্টিনা চাকমা ও প্রীতিবিন্দু চাকমা এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করছেন। অপরদিকে এআইপিপি’র সেক্রেটারি জেনারেল পল্লব চাকমা, আদিবাসী অধিকার বিষয়ক এক্সপার্ট মেকানিজম (এমরিপ)-এর ড. বিনোতাময় ধামাই এবং এআইওয়াইপি’র টনি চিরানও বাংলাদেশের আদিবাসীদের পক্ষে এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করছেন।
চঞ্চনা চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, বন, ভূমি ও পাহাড়ের প্রতি আদিবাসীদের অধিকারের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের রয়েছে প্রতিকূল প্রভাব। অপরদিকে, বন, ভূমি ও পাহাড়ের প্রতি আদিবাসীদের অধিকার তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সাথে গভীরভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, সড়ক নির্মাণের জন্য ঝিরি ও ঝর্ণা থেকে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন, সামরিক বাহিনী ও বহিরাগতদের কর্তৃক বেদখলকৃত ভূমিতে নির্বিচারে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, মনোকালচার বাগান সৃষ্টিতে প্রাকৃতিক বনের ধ্বংসাধন এর মত কার্যক্রমসমূহ পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি এবং ঐতিহ্যবাহী জুমচাষে প্রতিবন্ধকতা ডেকে আনছে।
সীমান্ত সড়ক নির্মাণের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্ভাব্য জায়গাসমূহ আত্মসাৎ করছে এবং তারা পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে, ২৬তম ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি) রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি ও জুরাছড়ি এলাকায় অবস্থিত গাছবাগান পাড়া ও থুমপাড়া নামে দুটি গ্রামে ২৩টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ করেছে এবং ১৭টি পরিবারকে জুমচাষে বাধা প্রদান করেছে।
ভূমি আত্মসাৎ ও আদিবাসী জুম্মদের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য সমস্যা বন্ধ করতে এবং আদিবাসী জুম্মদের অধিকার সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৭ সালে জুম্ম জনগণ ও সরকারের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে, এই অঞ্চলে বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধানাবলী প্রণয়ন করা হয়। ৭২টি ধারার মধ্যে কিছু মৌলিক ধারা হল সাধারণ প্রশাসন, আইন ও শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ এবং যোগোযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়সমূহ এসব পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা। অথচ, গভীর পরিতাপের বিষয় যে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর হতে ২৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও পরিষদসমূহে এসব বিষয় হস্তান্তর করা হয়নি।
এছাড়া এখনো পর্যন্ত সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ও সামরিক শাসন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি। এছাড়াও ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমি বিরোধসমূহ নিষ্পত্তি করা হয়নি। এককথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, এবং বন, ভূমি ও পাহাড়ের উপর আদিবাসী অধিকার এখনো পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি।”
বাংলাদেশ সরকারের নিকট আবেদনস্বরূপ, তিনি (চঞ্চনা চাকমা) স্থায়ী ফোরামের নিকট নিম্নোক্ত সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন:
১) জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করা, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আদিবাসী জুম্ম জনগণের প্রথাগত অধিকার অবশ্যই তুলে ধরতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে;
২) ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে, এবং আদিবাসী জুম্ম জনগণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া ভূমি ও সম্পত্তি অবশ্যই তাদের নিকট ফিরিয়ে দিতে হবে;
৩) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়-নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করতে হবে।


