মতামত ও বিশ্লেষণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: প্রথাগত আইন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বাস্তবতার সংঘাত

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: প্রথাগত আইন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বাস্তবতার সংঘাত
-ম্যাকলিন চাকমা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই গভীর দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। এই দ্বন্দ্ব কেবল বন উজাড় বা ভূমি ব্যবহারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্র বনাম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আইন বনাম বাস্তবতা এবং নিয়ন্ত্রণ বনাম অধিকার এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ মানে কেবল সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি খণ্ডচিত্র নয়; বরং একটি অসম ক্ষমতার কাঠামো, ইতিহাস এবং নীতিগত বৈপরীত্যকে গভীরভাবে বোঝা।

“Hill Resource Center”-এর “Back to the Roots” প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে মাননীয় চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় এর কাছ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত আইন, ভূমি অধিকার এবং বন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি মৌজা বন সরেজমিনে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা এই বিশ্লেষণকে আরও বাস্তবভিত্তিক করে তুলেছে বলে আমি মনে করি।

প্রথাগত আইন: স্বীকৃতিহীন কার্যকারিতা

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব শাসনব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো প্রথাগত আইন ও স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো। সার্কেল চীফ, হেডম্যান এবং কার্বারীদের মাধ্যমে পরিচালিত মৌজা-ভিত্তিক এই ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, ভূমি ব্যবহার এবং বন সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে।
এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কমিউনিটি-ভিত্তিক চরিত্র। মৌজা বন বা কমিউনাল বন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেকসইভাবে রক্ষা করা হয়। এতে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব হয়, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও সাংস্কৃতিক চর্চাও বজায় থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত কার্যকর একটি ব্যবস্থাকে কেন এখনো পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি? বাস্তবে ব্যবস্থাটি সক্রিয় থাকলেও রাষ্ট্রীয় নীতিতে এর স্বীকৃতি সীমিত। ফলে প্রথাগত আইন এক ধরনের “ডি-ফ্যাক্টো” ব্যবস্থা হিসেবে টিকে থাকলেও “ডি-জুরে” বা আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর বাইরে থেকে যায়। এটি কেবল নীতিগত দুর্বলতা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত অবহেলা বলেও মনে হয়।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো: নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি

পার্বত্য চট্টগ্রামে বন ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি মূলত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু হওয়া সংরক্ষিত বন ও রক্ষিত বন ঘোষণার ধারাবাহিকতা এখনো বহাল রয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে বন সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বর্তমানে বন বিভাগ দ্বারা পরিচালিত।
সংরক্ষিত বন ঘোষণার ফলে বাস্তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত অধিকার অনেক ক্ষেত্রে খর্ব হয়। যে বন তাদের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই বনেই তাদের প্রবেশ, ব্যবহার এবং অধিকার সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়।
প্রশ্ন জাগে—এই নীতিগুলো কি প্রকৃত অর্থে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য, নাকি সম্পদের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি উপায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া গৃহীত নীতিগুলো টেকসই ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

চুক্তি বনাম বাস্তবতা: অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসন, ন্যায়বিচার এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে।
ভূমি কমিশন এখনো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি, মালিকানা নির্ধারণ এবং দখল সমস্যা সমাধানে এর ভূমিকা প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর ক্ষমতা সীমিত, এবং বাস্তবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এখনো কেন্দ্রীয়ভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।

দ্বৈত শাসনব্যবস্থা: সংঘাতের স্থায়ী কাঠামো

পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় আইন এবং প্রথাগত আইনের সহাবস্থানকে প্রায়ই “আইনি বহুত্ববাদ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে বাস্তবে এটি একটি সমন্বিত বা সুশৃঙ্খল কাঠামো নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে সংঘাতের উৎস।
একই জমির ওপর একাধিক কর্তৃত্ব, অস্পষ্ট মালিকানা, এবং প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব একটি স্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই অনিশ্চয়তা কেবল উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে না; বরং সামাজিক অস্থিরতা এবং অবিশ্বাসের পরিবেশও তৈরি করে।
এ ধরনের দ্বৈত শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্যই সুফল বয়ে আনে না; বরং এটি একটি “গ্রে জোন” তৈরি করে, যেখানে আইনের প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচার উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

উন্নয়ন না পরিবেশ ধ্বংস?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্প, বাণিজ্যিক বাগান এবং ব্যক্তিগত বন ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এগুলোকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, এবং ভূমি অবক্ষয়—এসব ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। বাণিজ্যিক চাষ এবং মনোকালচার বন ব্যবস্থাপনা স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে।
অন্যদিকে মৌজা-ভিত্তিক কমিউনিটি ব্যবস্থাপনা, যা টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব, তা এখনো পর্যাপ্ত নীতিগত সমর্থন পায় না। এটি এক ধরনের স্পষ্ট নীতিগত বৈপরীত্য, যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

কোন পথে সমাধান?

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও ভূমি সংকট সমাধানে প্রচলিত “top-down” বা উপর থেকে আরোপিত নীতি কার্যকর নয়—এটি ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাস্তবমুখী এবং ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি।
সমাধানের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে

১.প্রথাগত আইন ও মৌজা ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান।
২.ভূমি কমিশনকে কার্যকর, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন।
৩.কমিউনিটি-ভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনাকে নীতিগতভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪.রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৫.স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে “উপকারভোগী” নয়, বরং “অধিকারভিত্তিক অংশীদার” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
এই পদক্ষেপগুলো কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও নির্দেশ করে।

নীতির পুনর্বিবেচনার সময়

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে প্রথাগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার বাস্তব উদাহরণ; অন্যদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, আইনি জটিলতা এবং অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা।
এই দুইয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না ঘটলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হবে। তাই এখনই প্রয়োজন নীতির মৌলিক পুনর্বিবেচনা। যেখানে বনকে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং মানুষের অধিকার, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তথ্যসূত্র:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, ১৯৯৭
২. বাংলাদেশ বন আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা
৩. Roy, Raja Devasish (2000). Traditional Customary Laws and Indigenous Peoples in CHT
৪. Adnan, Shapan (2004). Migration, Land Alienation and Ethnic Conflict in the Chittagong Hill Tracts

ম্যাকলিন চাকমা
*কবি,গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

Back to top button