জাতীয়

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার এবং অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে পার্বত্য মন্ত্রনালয় থেকে প্রত্যাহারের দাবি

আইপিনিউজ বিডি: আজ ০৩ মার্চ, ২০২৬ ইং, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন- এর উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি, সাগর রুনি মিলনায়তন হলে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা এবং অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে থেকে প্রত্যাহার ও দপ্তর পুনর্বন্টনের দাবিতে- এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন- এর যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেনের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির প্রমুখ।

আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে ধারাবাহিক ২৬ দফা বৈঠকের মাধ্যমে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। গত ২৮ বছর ধরে চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো অবাস্তবায়িত থাকায় পাহাড়ের আদিবাসী জনগণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে আছে এবং নাগরিক সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর নবগঠিত সরকার ইতিমধ্যেই কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ১৮০ দিনের কর্মসূচীর মাধ্যমে নানাক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহনের ঘোষণাও দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা এসকল কর্মসূচীকে স্বাগত জানাই এবং নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবগঠিত সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। সরকার ঘোষিত এই কর্মসূচীতে বাংলাদেশের এক দশমাংশ জায়গাজুড়ে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার তালিকার রাখার জরুরী আহ্বান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নিয়োগকৃত অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার ও দপ্তর পুনর্বন্টনের দাবি নিয়ে আজকে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আমরা প্রত্যাশা রাখতে চাই যে, ঘোষিত কর্মসূচীগুলোতে জন-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে এবং দেশ একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবে।

তিনি আরো বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফা কর্মসূচীর মাধ্যমে বহুজাতির “সম্প্রীতিমূলক সমন্বিত রাষ্ট্রসত্তা (রেইনবো নেশন)” বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিএনপির এই বহুজাতির বাংলাদেশ গঠনকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপি ঘোষিত বহুজাতির “রেইনবো নেশনে”র বুনিয়াদ মজবুত করার লক্ষ্যে সরকারের উচিত হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং দপ্তর পুনর্বণ্টন করা। আমরা প্রত্যাশা রাখবো ২০০১ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেমনি রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রেখেছিলেন ঠিক তেমনি তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সচল রাখতে বিচক্ষণ ভূমিকা রাখবেন।

যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এক দশকের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ছোট মন্ত্রণালয়। এখানে মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি একজন অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ও সেটেলার বাঙালিদের মধ্যে একটি বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি বিদ্যমান। সেই বিরোধকে টিকিয়ে রেখে পাহাড়কে অশান্ত করার কোনো চিন্তা আমরা করতে চাই না। কাজেই এই চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নই হবে এ এলাকায় শান্তি ও স্তিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উদ্যোগ।

আসাদুজ্জামান মাসুম সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাহার করে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হোক, যাতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।

মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পরে গঠিত হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ক, খ, গ ও ঘ—এই চারটি খণ্ডে মোট ৭২টি ধারা রয়েছে। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। কাজেই সেটিকেই আমাদের মানতে হবে এবং যাই করিনা কেন সেটা যেন চুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।

দীপায়ন খীসা আরও বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময় পার্বত্য জেলা পরিষদে সর্বাধিক বিভাগ ও দপ্তর হস্তান্তর করা হয়েছিল। বিএনপি বর্তমান নেতৃত্বে থাকা তারেক রহমান পাহাড় ও সমতলের সকল মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন। একই সঙ্গে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কাজেই আমরা আশা রাখবো আগামীতে এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন সরকারের কর্মসূচীতে থাকবে। সরকার ঘোষিত অঙ্গীকার ও চুক্তির বিধানসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকার সময় থেকেই আমি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম যাতে পাহাড় ও সমতলের মানুষের সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গঠন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের দাবিতে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন করে আসছেন। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা বরাবরই সোচ্চার । দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার অবসান ঘটবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। কাজেই এ সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উক্ত সংবাদ সম্মেলন থেকে নিম্নোক্ত ৫টি দাবি তুলে ধরা হয়—
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ভিত্তিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করা।

২. অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরীবিক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন করা।

৩. দ্রুততম সময়ে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করা।

৪. অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ আয়োজন করা।

৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহারপূর্বক দপ্তর পুনর্বণ্টন করা।

Back to top button