পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আগামীকাল শাহবাগে প্রগতিশীল ছাত্র ও যুব সংগঠনসমূহের সমাবেশ
অনুপম ঘাগ্রা, আইপিনিউজঃ আগামীকাল ২৫ জুলাই মঙ্গলবার বিকাল ৩ টায় ঢাকার শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে শামিল বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠনসমূহের উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়নের ৫ দফা দাবিতে গণসংগীত, ছাত্র-যুব সংহতি সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
আদিবাসী ও বাঙ্গালী বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র ও যুবদের সংগঠনসমূহ যৌথভাবে এই গণসংগীত, ছাত্র-যুব সংহতি সমাবেশ ও মিছিলের আয়োজন করবে। আয়োজক সংগঠন সমূহের মধ্যে রয়েছে যুব মৈত্রী, যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম সহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন।
উক্ত মিছিল ও সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সভাপতি তৌহিদুর রহমান তৌহিদ এবং সঞ্চালনা করবেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এর সভাপতি দীপক শীল। এছাড়াও বক্তব্য রাখবেন জাতীয় যুব জোটের সভাপতি রোকনুজ্জামান রোকন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন এর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নান্নু, আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান, জাতীয় আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতি হরেন্দ্র নাথ সিং, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চ্যং য়্যং ম্রো, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ) এর সভাপতি বাশিদুল হক ননী. পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক জগদীশ চাকমা, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী সভাপতি অতুলন দাস, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল) সভাপতি গৌতম চন্দ্র শীল প্রমুখ। উক্ত সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন এর যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
এ আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে আইপিনিউজকে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন এর সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, “বিষয়টি খুবই সেন্সিটিভ এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলমান, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই ২৫ বছরে চুক্তির প্রায় ৭৫ ভাগ অবাস্তবায়িত। এটাকে কেন্দ্র করে শুধু পাহাড়ের আদিবাসী বা সমতলের আদিবাসীরা নয়, আমরা যারা প্রগতিশীল রাজনীতি করি, সকল ছাত্র ও যুব সংগঠন মিলে আগামীকাল আমরা শাহবাগে সমাবেশ করছি।”

তিনি আরও বলেন, “মূলত সরকারের প্রতি আমাদের দাবি- শান্তিচুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন করা। পাহাড়ে, বিশেষ করে তিন পার্বত্য জেলায়, যেখানে এখন সেনা শাসনের মতই একটা ব্যবস্থা বহাল আছে একটা গণতান্ত্রিক দেশে! আপনি যদি নিজেও পাহাড়ের দিকে যান দেখবেন যে, গভীর রাতে গাড়ি থামিয়ে আপনার আইডি চেক করা হবে বা আপনার পরিচয় জানার চেষ্টা করবে, এটা গণতান্ত্রিক দেশে মানা যায় না।”
তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করে বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষায় বঞ্চিত ছিল, তাদের যে নৈতিক অধিকার সেখান থেকে বঞ্চিত ছিল। তারপর চুক্তির ফলে, তারা দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম থেকে বের হয়ে আসে সাধারণ জীবনে, বর্তমানে এ চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর যে দাবি, সে দাবির প্রশ্নে, চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার কতটা ইচ্ছুক! এ বিষয়ে আমরা সন্দেহ প্রকাশ করছি। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়, তারপরও কোনো অগ্রগতি নেই, এ কারণেই এটি খুবই প্রাসঙ্গিক এ সময়ে এসে”।
যুব মৈত্রীর সভাপতি তৌহিদুর রহমান তৌহিদ আইপিনিউজকে বলেন, “এই সমস্যার শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল এবং তাদের ছাত্র ও যুব সংগঠনসমূহ পার্বত্য চুক্তির পক্ষে ছিল। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলে একাত্ব এবং এ লড়াইয়ে সবসময় আমরা সক্রিয়। সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি যে চুক্তি করে ১৯৯৭ সালে, তার পূর্ন বাস্তবায়ন-ই হলো আমাদের দাবি।”
তিনি আরও বলেন, “যে কোন একটা সভ্য সমাজে যদি কোন চুক্তি হয়, বিশেষ করে সরকারের সাথে, সে চুক্তির অবশ্যই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। এর পূর্ন বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট জনপদের ও রাষ্ট্রের জন্য পজিটিভিটি নিয়ে আসবে”।
তিনি উল্লেখ করেন, এ সরকারের সময় এবং বর্তমান সরকার প্রধানের অধীনেই চুক্তিটি করা হয়েছে, তিনি এর পূর্ন বাস্তবায়নের দাবি জানান ও সকলকে সংহতি সমাবেশে যোগদানের আহ্বানও জানান।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক জগদীশ চাকমা বলেন, “চুক্তির যেহেতু ২৫ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে ইতোমধ্যে, সরকার যেহেতু চুক্তি বাস্তবায়ন করছেন না, সে কারণে আমরা পাহাড় এবং সমতলের সকল প্রগতিশীল সংগঠনগুলো মিলে এই আয়োজন করতে যাচ্ছি। আমরা মনে করি যে, পাহাড়ে যদি আমরা শান্তি দেখতে চাই তাহলে এই চুক্তি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই”।
তিনি আরও বলেন, “সেই প্রেক্ষিতেই আমরা সকল ছাত্র এবং যুব জোট মিলে চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের নিকট জোর দাবি জানাবো। আমরা মনে করি চুক্তি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই এবং এই কারণেই আমরা আন্দোলনে নেমেছি।”
আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অলিক মৃ বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছরেও এর মূল ধারাগুলোর বাস্তবায়ন ঘটে নাই। এই চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিকে কেন্দ্র করেই সারা বাংলাদেশে একটা নাগরিক সমাজের প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে যা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’। ইতোমধ্যে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহ এই চারটি বিভাগে, এই প্লাটফর্মের ব্যানারে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন আদিবাসী ও বাঙ্গালি ছাত্র ও যুব সংগঠন মিলে আমরা রাষ্ট্রকে ও দেশবাসীকে জানাতে চাচ্ছি যে, ২৫ বছর আগে ১৯৯৭ সালে যে শান্তি চুক্তি হয়েছে, আজ ২৫ বছর পর এসেও তার কোন পূর্ণ বাস্তবায়িত রূপ নাই, এই বিষয়টিই আমরা দেশবাসীকে বলিষ্ঠ কণ্ঠে জানাতে চাচ্ছি।”
বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান বলেন,”সরকারের সাথে জুম্ম জনগণের যে চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল আজ থেকে ২৫ বছর আগে, এর কোন বাস্তবায়িত রূপ আমরা দেখিনা। আমি মনে করি, রাষ্ট্রের একটা দ্বায়িত্ব রয়েছে এই চুক্তিটি দ্রুত এবং যথাযথ ভাবে বাস্তবায়িত করার। এই দাবি শুধুমাত্র আদিবাসীদেরই না, দেশের প্রত্যক সচেতন নাগরিকের।”
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, “পার্বত্য চুক্তি-বিষয়টি প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের জানা দরকার এবং এই আন্দোলনে প্রত্যেক নাগরিকের যোগদান আমি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষে ৫ দফা দাবি রয়েছে, তারই পাশাপাশি সমতলের আদিবাসীদের জন্যে দুটি পৃথক দাবি রয়েছে। প্রথমত, সমতল আদিবাসী আধ্যুষিত এলাকায় স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ন জায়গাগুলিতে আদিবাসীদের জন্যে আসন সংরক্ষণ করা, দ্বিতীয়ত, সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।”
আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল বিকাল ৩ টায় ঢাকার শাহবাগ এলাকার প্রজন্ম চত্বরে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সম্মিলিত বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলুন’ শ্লোগান নিয়ে গণসঙ্গীত ও ছাত্র-যুব সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সমাবেশ শেষে সেখান থেকে একটি মিছিলও বের করা হবে।এছাড়াও আয়োজকদের পক্ষ থেকে উক্ত অনুষ্ঠানে দলে দলে যোগাদান করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
আয়োজকরা সরকারের নিকট নিম্নোক্ত ৫ দফা দাবি জানিয়েছে:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করতে হবে।
৩. আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক করা এবং স্থানীয় শাসন নিশ্চিত করতে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক এসব পরিষদের যথাযথ ক্ষমতায়ন করতে হবে।
৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শারণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাঁদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. দেশের মূল শ্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
উক্ত কর্মসূচিকে সফল করার লক্ষে বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্যোগে গত ২১ জুলাই সকালে ঢাকার পল্টন প্রেসক্লাব ও শিল্পকলা একাডেমি এলাকায় বিভিন্ন স্তরের জনগণের মধ্যে অনুষ্ঠানের প্রচারপত্র বিতরণ করতে দেখা গেছে।
উল্যেখ্য, ১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সাক্ষরিত হয়। যা শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত। আদিবাসীদের দাবি, চুক্তির ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তির মূল বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেনা। যার কারণে পাহাড়ে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা এখন হুমকির মুখে। পাহাড়ের শান্তি ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দাবি করে ছাত্র যুবরা বলছেন, সরকারকে দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়ন করে প্রান্তিক আদিবাসীদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ের সাধারণ প্রান্তিক মানুষের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবেনা।


