মতামত ও বিশ্লেষণ

ঝিমাই পুঞ্জির খাসিদের অস্তিত্ব রক্ষায় এগিয়ে আসুন-সিলভানুস লামিন

এক
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রায়ই ঝিমাই খাসি পুঞ্জিতে যাওয়া হতো আমার। কখনও কোন ধর্মীয় উৎসবে, কখনো বন্ধুবান্ধবদের সাথে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে আবার কখনও আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে। নুনছড়া পুঞ্জি থেকে শুরু করে পুথিছড়া, আমলি ও বালাইরমা পুঞ্জির পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে ঝিমাই পুঞ্জিতে পৌছতাম। খুব বেশি সময় লাগতো না। এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগতো ঝিমাই পুঞ্জিতে পৌছুতে। পুঞ্জির চারদিকই শুধু গাছ ও আর গাছ। দেশীয় প্রজাতির গাছ। লতা জাতীয় পান ওই গাছগুলো বেয়ে উপরে উঠে। তাই গাছের পুরো শরীরেই পানের লতাপতা দিয়ে ঠাসা! চারপাশ সবুজ, সতেজ ও প্রাণবন্ত। এসব দৃশ্য দেখলে অন্যরকম একটা ভালো লাগার অনুভূতি ভেতরে জন্ম নেয়! প্রায়ই প্রতিটি খাসি পুঞ্জিতেই এরকম দৃশ্য বিদ্যমান। কারণ খাসিরা প্রকৃতিনির্ভর জীবিকা নির্বাহ করেন পান চাষের মাধ্যমে। পান চাষের জন্য গাছ একটি অত্যন্ত অতাবশ্যাকীয় প্রাকৃতিক উপাদান। এবং সেটি অবশ্যই হতে হবে দেশীয় প্রজাতির গাছ। এ গাছ ছাড়া পান চাষ করা একদম সম্ভবই না! যাহোক ঝিমাই পুঞ্জিতে যাওয়া হয়নি প্রায় ৩০ বছর অধিক সময় ধরে। ছোট্টকালে আমার দেখা বৃক্ষগুলো আরও বড় হয়েছে, ছোট বৃক্ষগুলোও নিশ্চয়ই বড় হয়েছে। শুনেছি কেদারপুর টি কোম্পানি ওইসব গাছ কাটার পাঁয়তারা করেছে চা বাগান সম্প্রসারণ করার জন্য। অবশ্য কেউ কেউ অভিযোগ করে বলেছেন, বাগান সম্প্রসারণ ঐচ্ছিক বরং গাছ বিক্রি করে মুনাফা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য! কেদারপুর টি কোম্পানির উদ্দেশ্য মুনাফা না চা বাগান সম্প্রসারণ যাই হোক না কেন তাদের এই উদ্দেশ্য ঝিমাই পুঞ্জির হেডম্যান বা মান্ত্রী রানা সুরংসহ অনেক পুঞ্জিবাসীকে বিদীর্ণ করেছে। রানা সুরংসহ ঝিমাই পুঞ্জির প্রতিটি খাসি পরিবার আজ তাই ভালো নেই! আতংকে আছেন। নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ হওয়ার আতংকে তাঁদেরকে গ্রাস করছে প্রতিদিন।

দুই
রানা সুরংরা তাদের লালিত, পালিত ও যত্নে গড়ে বেড়ে ওঠা ২০৯৬টি গাছ সুরক্ষা করতে চাইছেন। এ গাছ সুরক্ষিত হলে সুরক্ষিত হবে তাদের প্রকৃতিনির্ভর জীবিকাও! এসব প্রবীণ ও নবীন গাছ কাটার খবর শোনার পর থেকেই ঝিমাই পুঞ্জিবাসীদের ঘুম নেই, খাওয়া, দাওয়া-নাওয়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এসব গাছ কাটা হলে তাদের পানবাগানের অস্তিত্বও যে বিলীন হয়ে যাবে! কোথায় যাবেন তারা? কী খেয়ে পড়ে বাঁচবেন? যে ছোট্ট শিশুরা এই পুঞ্জিতে রয়েছে তাদের ভবিষ্যত কী হবে? যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে তাদের কী হবে? নিজ বসতভিটা ও জীবিকা হারালে তাদের অভিভাবক কীভাবে তাদের লেখাপড়ার খরচ যোগাবেন? অন্যদিকে যারা ঝিমাই পুঞ্জির পান চাষ, প্রক্রিয়াজাত, বাজারজাতকরণের সাথে জড়িতে তারা কোথায় যাবেন? তাঁরাও যে কর্মহীন হবেন, জীবিকাহীন হবেন! আমার পরিচিত অনেক বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাংক্ষী আছেন এই পুঞ্জিতে। আতংকে ও অনিশ্চয়তায় তাদের দিন অতিবাহিত হচ্ছে। তাদের সাথে হয়, তাদের কষ্টগুলো শুনে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাই না! কী বলে সান্ত্বনা দেব? শুধু ঝিমাই পুঞ্জি নয়; প্রায় প্রতিটি খাসি পুঞ্জিই আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব খাসি পুঞ্জিতে ও পান বাগানে হাজার হাজার গাছের দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে অনেক প্রভাবশালীর! তবে হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখতে পাই যখন দেখি ঝিমাই পুঞ্জিসহ ওই পুঞ্জির গাছগুলো রক্ষা করার জন্য নানান সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন, ব্যক্তি, সুশীল সমাজ অংশগ্রহণে নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন খাসিসহ আদিবাসী সংগঠনগুলো। এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আদিবাসীদের এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে বাপা, বেলা, নিজেরা করি, এএলআরডি, আইপিডিএস, ব্লাষ্টের মতো জাতীয় বেসরকারী সংগঠনগুলো।

সরকার কী সদয় দৃষ্টি দেবে? ক্ষুদ্র এই জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষায় পদক্ষেপ কী নেবে? আশা করি সরকার নিশ্চয়ই ঝিমাই পুঞ্জির ৭২টি খাসি পরিবারসহ অন্যান্য খাসি পুঞ্জির খাসিদের জীবিকা ও অস্তিত্ব সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে! কারণ সরকারকে বুঝতে হবে এ প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণকারী আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত হলে দেশের পরিবেশ ও প্রকৃতিও সমৃদ্ধ হবে।

তিন
ঝিমাই পুঞ্জির মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকা দিয়েই পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষা করে আসছেন। শুধু ঝিমাই নয়; বাংলাদেশে প্রতিটি খাসি পুঞ্জিই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় অবদান রেখে চলেছে বছর পর বছর। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, সিলেট বিভাগের যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক বন ও পরিবেশ রয়েছে, যেসব এলাকায় সংখ্যাধিক্য গাছ রয়েছে সেসব এলাকায় খাসিরা বসবাস করেন। অন্যদিকে খাসিদের বিশেষ পান বাগান স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে এক সবুজ আবহ তৈরি করে। শুধু জীবন-জীবিকা নয়; এই পানবাগান ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সংরক্ষণে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যা নানা গবেষণায় প্রমাণিত। পানপুঞ্জিগুলো পরিবেশ সুরক্ষা করে জীবন-জীবিকার যে ধরন তৈরি করেছে তা বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকার বৃক্ষরোপণ, প্রাকৃতিক বন রক্ষা এবং কম কার্বন জীবন-জীবিকা নির্বাহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আর খাসিরা অক্ষরে অক্ষরে সরকারের সেই নির্দেশনা পালন করছে।

খাসিদের পান বাগানে গেলে হরেক রকমের দেশীয় প্রজাতির গাছ দেখা যাবে, যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে। এছাড়া কখনও কখনও খাসিরা তাদের প্রয়োজনের তাগিদেই পান চাষের জন্য অনাবাদী ও খালি জায়গায় গাছ রোপণ করে থাকেন। শুধু গাছ রোপণ করা নয়; এসব প্রাকৃতিক বন, বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় খাসিরা বেশ দক্ষও বটে।

কেদারপুর টি কোম্পানি যে ২০৯৬টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেসব গাছ খাসিদের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বেড়ে উঠেছে। এসব গাছ এলাকার নিঃসৃত কার্বন শোষণ করে স্থানীয় পরিবেশকে নির্মল করতে ভূমিকা রাখছে। এসব গাছ এলাকার জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। হাজার হাজার প্রাণ (পাখি, পোকামাকড়, প্রজাপতিসহ আরও অনেক প্রাণ) এসব গাছগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, খাদ্য সংগ্রহ করছে এবং বাসা বাঁধছে। তাই আশা করছি, প্রাকৃতিক বন, পরিবেশ ও বৃক্ষ সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় খাসিদের অবদানকে বিবেচনা করে সরকার ঝিমাইসহ খাসি পুঞ্জিগুলো সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে। খাসিদের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এলাকার খাসিদের সাথে পরামর্শ করবে।

সিলভানুস লামিন, উন্নয়নকর্মী

Back to top button