শিক্ষাশিল্প ও সংস্কৃতি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী’র ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, চট্টগ্রামঃ আজ ১৮ আগস্ট ২০২৬ (মঙ্গলবার) “ঐতিহ্যের আলোয় এক দশক; শেকড়ের টানে, সংস্কৃতির জয়গানে” স্লোগানকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী’র ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ মিলনায়তনে বিকাল ৩:০০ ঘটিকায় অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন এবং উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রধান উপদেষ্টা, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাঞ্চন চাকমা। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জুম ঈসটেটিকস কাউন্সিল (জাক)-এর সভাপতি শিশির চাকমা, চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউনিয়নের সভাপতি মংক্য শোয়েনু নেভী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পাহাড়ী এলামনাই এসোশিয়েনর সভাপতি গৈরিকা চাকমা প্রমুখ। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি জাল্লাং এনরিকো কুবি ও সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শ্রেয়া তালুকদার। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠীর সাংগঠনিক সম্পাদক ক্যাপরিও চাকমা এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রিবেক চাকমা।

অনুষ্ঠানে ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদান রখার স্বীকৃতি স্বরূপ জুম ঈসটেটিকস কাউন্সিল (জাক)-এর সভাপতি শিশির চাকমাকে রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী কর্তৃক সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী শিল্পসত্তা নিয়ে আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে বৈচিত্র্যময়তাকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে রঁদেভূকে পিছিয়ে পড়া আদিবাসীদের মধ্যেও অধিকতর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। আদিবাসীদের মধ্যে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাদের এক্ষেত্রে নিরলস প্রচেষ্টা থাকতে হবে। 

উদ্বোধক প্রফেসর ড. কাঞ্চন চাকমা বলেন, রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সাথে আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। রঁদেভূ এক দশকের পথচলা আদিবাসী জীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও অধিকতর সক্রিয় হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

শিশির চাকমা বলেন, আদিবাসী সংস্কৃতি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রঁদেভূ যে অবদান রেখে যাচ্ছে সেটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশের সময়কাল পর্যন্ত যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়ে আসা আদিবাসী জনগণের অধিকারহীনতা এবং সংস্কৃতিগত আগ্রাসন এই জাতিগুলোকে অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় রঁদেভূকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কন্ঠকে মূলধারায় নিয়ে আসতে অধিকতর কাজ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রান্তিক মানুষের জীবনধারা ও মূল্যবোধ তুলে ধরার কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কিংবা বিগত সরকারগুলো ছলচাতুরী করেছে। আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি না দিয়ে গোটা বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর সাথে অবহেলা ও বৈষম্য করে যাচ্ছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের প্রতি অবহেলার চূড়ান্ত পরিণতি বাংলাদেশকেই একদিন ভুগতে হবে। কাজেই রাষ্ট্রের বৈষম্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা সংরক্ষণ, চর্চা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে।

মংক্য শোয়েনু নেভী বলেন, আমার সামাজিক জীবনের প্রারম্ভ রঁদেভূর মতো প্লাটফর্ম থেকে বিকশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার উর্বর ক্ষেত্র সেটা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক রূপ ধারণ করেছে। বিশ্বের দেশে দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রকাশের ক্ষেত্রকেও বিকাশের পথে এগিয়ে নিতে তাড়িত করেছে। রঁদেভূ শুধুমাত্র পার্বত্য এলাকা নয়, গোটা দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরেও তার কার্যক্রমকে বিকশিত করবে। বিভিন্ন এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মিলনক্ষেত্র তৈরি করবে। আদিবাসীদের চিন্তা, চেতনা ও উত্তরাধিকার জ্ঞানকে আরো প্রস্ফুটিত করবে।

গৈরিকা চাকমা বলেন, সাহিত্য-শিল্পভাবনায় আদিবাসী শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাচ্ছে সেটা অত্যন্ত আশার বিষয়। এভাবেই বর্তমান প্রজন্মকে আদিবাসী জাতিগুলোকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে হবে। রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠীকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর  জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পাশাপাশি সুষ্ঠু বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে। এভাবে পাহাড় ও সমতল অঞ্চলে বসবাসরত সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তা তার প্রাণ ফিরে পাবে। 

শুভেচ্ছা বক্তব্যে রিবেক চাকমা বলেন, আদিবাসী সমাজের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের জন্য রঁদেভূর মত সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা অপরিসীম। রঁদেভূকে তার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও প্রান্তিক কন্ঠস্বরকে রাষ্ট্রীয় মূলধারায় তুলে আনার প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে। যুগে যুগে নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গিয়েছেন, যে ভূমিকা রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী ও তার কর্মীবৃন্দকেও পালন করে যেতে হবে। তাই রঁদেভূকে প্রথাগত কাঠামোয় একটা সংগঠনের চাইতেও একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়ে উঠতে হবে।

পরিশেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি জাল্লাং এনরিকো কুবির সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘটে

পরবর্তীতে রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান-নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

Back to top button