আঞ্চলিক সংবাদ

কলাপাড়ার ছ-আনী পাড়ার রাখাইনদের পুনর্বাসনের আহ্বান

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): পায়রা বন্দরের উচ্ছেদ হওয়া ছ আনী পাড়ার রাখাইনদের সম্মানজনক পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের বিষয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। আজ শনিবার পটুয়াখালীর কলাপাড়া প্রেসক্লাবে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে সরেজমিন পরিদর্শনরত নাগরিক প্রতিনিধি দল।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ নাজমুল হক প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, কলাপাড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি হুমায়ন কবীর প্রমুখ।

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, আমরা আসলে সত্যিই লজ্জ্বিত। আমরা দেখেছি কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পাহাড়ের চাকমা জনগোষ্ঠীদের যেভাবে পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হয়েছিল তা এখনো সে জনগোষ্ঠীর মানুষকে ভুগতে হচ্ছে। এখানেও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ছ আনী পাড়ার মাত্র যে ছয় পরিবার ছিল তাদেরকে উচ্ছেদ করেছে। এটা একেবারেই দুঃখজনক। আমরা চাই দেশটা ফুলের বাগানের মত হোক। ফুলের বাগানে কেবল গোলাপ থাকে না। সব ফুলই যেন বিকশিত হতে পারে। তার জন্য সাংবাদিকদেরকে দায়িত্বশীল ভ‚মিকা নিতে হবে । তবেই আমরা সংখ্যালঘু সকল জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।

একসময় এই পটুয়াখালীর কলাপাড়া খেপুপাড়া রাখাইন আদিবাসীদের দখলে ছিল। এখন তাদের সংখ্যা পাঁচ হাজারের নিচে নেমে এসেছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, আমাদের নৃবিজ্ঞানের ভাষায় ‘আনপিপলিং’ বলে একটা কথা আছে। এর মানে হল একসময় কোনো একটা অঞ্চলে কোনো এক জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা আর সেখানে নেই। তাদের সাংস্কৃতিক কিছু বিষয় অবশিষ্ট আছে কেবল। এই পটুয়াখালী অঞ্চলে এসে আমরা তার প্রমাণ দেখতে পায়।

তিনি আরো বলেন, এখানে ছ আনী পাড়া নামক একটা গ্রাম ছিল। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদেরকে উচ্ছেদ করেছে। অনেক চেষ্টা ছিল তাদেরকে যেন উচ্ছেদ করা না হয়। কিন্তু অনেক দেন-দরবারের পর এই রাখাইন আদিবাসীরা তাদের বাস্তুভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারা নিজেদের বাস্তুভিটা ছেড়েছে সম্মানজনক পুনর্বাসনের শর্তে। কিন্তু তাদেরকে এখনো পর্যন্ত সম্মানজনক পুনর্বাসন করা হয় নি।

তিনি আরো বলেন, ছ আনী পাড়ার রাখাইনদের অনেক ‘কমন প্রপার্টি’ ছিল। সেগুলোর কোনো ধরণের পুনর্বাসন পায়নি তারা। তাদেরকে এখন ভাড়া বাড়ীতে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশ মাস পরও তাদেরকে সম্মানজনক পুনর্বাসন করা হয় নি। আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এখনো দাবি করছি যেন এই সংখ্যালঘু রাখাইন আদিবাসীদের সংখ্যাশুন্য করা না হয়।

ছ আনী পাড়ার উচ্ছেদ হওয়াদের অন্যতম সিং দা মো রাখাইন বলেন, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে বলেছিল সম্মানজনক পুনর্বাসন করবে।তার আগ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ীতে রাখার যে কথা তাও তারা রাখে নি। ছয় মাস বাসা ভাড়া দিয়ে তারা আর কোনো ধরণের খরচ দেয়নি। আমরা চাই আমাদেরকে সম্মানজনক পুনর্বাসন করা হোক। আমাদেরকে এমন রাখাইন পাড়ায় পুনর্বাসন করা হোক যেন যেখানকার শশ্মান, বৌদ্ধ মন্দির ও পুকুর আমরা ব্যবহার করতে পারি। ছ- আনী পাড়ায় আমরা যেভাবে ছিলাম, সেভাবেই যেন আমাদেরকে রাখা হয়।আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নয়। কিন্তু মানুষকে উচ্ছেদ করে যেন উন্নয়ন করা না হয়।

নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, রাষ্ট্র কতটা অমাণবিক হতে পারে আমরা তা দেখলাম। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ছ আনী পাড়ার রাখাইনদের উচ্ছেদ না করেও স্থাপনা করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে রাখাইন আদিবাসীদের উচ্ছেদ করছেন। আমরা অনেকটা মেজোরেটারিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশটাকে এগিয়ে নিচ্ছি। আমরা বহুত্বকে গ্রহন করছি না, সংবিধানকে মানছি না। আমরা শুধুমাত্র কয়েকটা পদ্মা ব্রিজ দেখে খুশি হতে পারি না। কেননা, যে বহুত্বের জন্য আমরা লড়াই করেছি সেই বহুত্ব আর টিকে থাকছে না। আমরা নাগরিকরা এখনও সংহতি জানাচ্ছি যে, যেন বাংলাদেশের যে বহুত্বের সৈন্দর্য সেটা রক্ষা হয়।

মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ও আইনজীবি এডভোকেট প্রকাশ বিশ্বাস, সাংবাদিক হারুন-অর রশীদ, কালের কন্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি জসিম পারভেজ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মং চোথিন তালুকদার, ছ-আনী পাড়ার উচ্ছেদের শিকার ও শিক্ষানবিস নারী আইনজীবি লাখাইন রাখাইন প্রমুখ।

Back to top button