আঞ্চলিক সংবাদ

পটুয়াখালীর রাখাইন আদিবাসীদের রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের: মতবিনিময় সভায় বক্তারা

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): পটুয়াখালীর কুয়াকাটা রাখাইন জনপদ সরেজমিন পর্যবেক্ষণ শেষে আজ এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ঢাকা থেকে আগত নাগরিক প্রতিনিধি দল। পটুয়াখালীর হোটেল হিলটন মিলনায়তনে আজ সকাল ১০.০০ টায় এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় মতবিনিময় সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সাংসদ ও বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম প্রধান, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, পটুয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদক দৈনিক সাথী আনোয়ার হোসেন, পটুয়াখালী সরকারী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোসাদ্দের হোসেন বিল্লা, কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বোৗদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ ইদ্রবংশ ভিক্ষু প্রমুখ। এছাড়া সভায় অংশ নেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।

সভায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক প্রতিনিধি দলের সদস্য ও সাংবাদিক এডভোকেট প্রকাশ বিশ্বাস। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বহু সংস্কৃতি ও বহু জীবনের এক বৈচিত্র্যময় দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জাতি ছাড়াও এখানে ৫১ বা তারও কম বেশি আদিবাসী জাতির বসবাস। দেশের মোট ৩০ লাখ আদিবাসী জনসংখ্যার ভেতর রাখাইনদের সংখ্যা বর্তমানে মাত্র কয়েক হাজার। বৃহত্তর বাঙালিসহ মূলধারার কাছে দেশের সকল আদিবাসী জাতিসমূহের আত্মপরিচয় এখনো অস্পষ্ট।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের রাখাইনদের মূলত বসতি মূলত নদী ও সমুদ্র উপকূল। পটুয়াখালী, বরগুণা থেকে শুরু করে কক্সবাজার। এ অঞ্চলের আদি নামগুলিও রাখাইনদের ভাষায়। যেমন, ক্যানছাই চোয়ান। আজ এই নামটি বদলে গেছে, এখন এটি পটুয়াখালীর কুয়াকাটা-দেশের এক অন্যতম পর্যটনস্থল। রাখাইনদের জনসংখ্যা ও বসতি অঞ্চলের সুস্পষ্ট কোনো হালনাগাদ তথ্য ও পরিসংখ্যান হাতের নাগালে পাওয়া যায় না। ১৭৮৪ সনে পটুয়াখালীর সমুদ্র উপকূলে রাখাইন বসতিস্থাপনের ইতিহাস জানা যায়। ১৭৮৪-১৯০০ সালের দিকে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০,০০০ এর বেশি রাখাইনরা বসবাস করত। ১৯০০-১৯৪৮ সালে এই সংখ্যা হয় ৩৫,০০০। ১৯৯০ সালে ৪০০০ জন। ২০১৪ কারিতাস বরিশাল অঞ্চলের ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আইসিডিপি-রাখাইন) জরিপ অনুযায়ী অত্র উপকূলীয় অঞ্চলের রাখাইন জনসংখ্যা প্রায় ২৫৬১ ।

পটুয়াখালী ও বরগুণা অঞ্চলের প্রবীণ রাখাইনদের সাথে আলাপ করে মোট ২৩৭টি রাখাইন গ্রামের নাম পাওয়া যায় দাবি করে তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ১৯২টি রাখাইন গ্রামের কোনো হদিশ নেই। বর্তমানে সেখানে কোনো রাখাইন বসতি নেই, বসবাস করছেন বাইরে থেকে আসা বাঙালিরা। বর্তমানে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ২৮টি এবং গলাচিপা উপজেলায় ৪টি রাখাইন গ্রাম আছে। বরগুণা জেলার তালতলী ও সদরে ১৩টি রাখাইন গ্রাম আছে। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে রাখাইনদের জনমিতির সূত্রমতে মাত্র দুইশ বছরে, প্রায় ৮১ ভাগ রাখাইন গ্রাম বেদখল হয়ে রাখাইনশূণ্য হয়েছে এবং রাখাইন জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৯৫ ভাগ। রাখাইন জনগোষ্ঠীর এই নির্মম পরিণতি ও অন্যায় ভূমি দখলের বিরুদ্ধে আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য ন্যায়বিচারের নমুনা দেখিনি। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে গ্রাম থেকে স্থানীয় সরকার কী স্থানীয় প্রশাসন সকলকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত নির্বিকারই দেখেছি।

সভাপতির বক্তব্যে সাবেক সাংসদ ও বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম প্রধান বলেন, একটি দেশে সকল ধরনের জাতিসত্তা থাকলে সেদেশের সৌন্দর্য বাড়ে। এসব জাতিগোষ্ঠীরা ফুলের বাগানের ফুলের মতো। সকল ফুলের সমাহারে বাগানের সৌন্দর্য বাড়ে। কিন্তু মালি যদি এক ধরনের ফুলের প্রতি যতœ নেয়, তাহলে সৌন্দর্য থাকবে না। ঠিক তেমনই রাষ্ট্র শুধু একটি জাতি বা ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করলে রাষ্ট্রের সৌন্দর্য থাকে না। পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বিদ্যুৎ প্রকল্পের সময় অনেক আদিবাসীদের বিতাড়িত করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই দেশে আবারো পাকিস্তানের মতো অন্য জাতিগোষ্ঠীদের নিপীড়ন করা হচ্ছে। আমরা এর অবসান চাই।

মতবিনিময় সভায় পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া ছ আনী পাড়ার বাসিন্দা চিং ধা মো রাখাইন বলেন, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদেরকে আজ বিশ মাস পর্যন্ত উচেছদ করে আমাদেরকে বাসা ভাড়া করে রেখেছে। তারা আমাদেরকে স্থাপনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিলেও সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করছে না। আমরা যে জায়গায় আছি সে জায়গার বাঙালি’দের সাথে খাদ্যভাস মিলে না। ফলে আমাদেরকে নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই কোনো এক রাাখাইন গ্রামের কাছে খাস জমি নিয়ে সেখানে আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি চর্চা করা যাবে এমন জায়গায় আমাদেরকে পুনর্বাসন করা হোক।

কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু বলেন, কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার কারণে আমাদের এলাকার জমির দাম বেড়েছে। ফলে ক্রমান্বয়ে আমাদের শশ্মান দখল করা হয়েছে। এখন আমাদের বৌদ্ধ বিহারের ভ‚মিও দখল করা হচ্ছে। আমাদের বিহারের পাশ দিয়েই বেরিবাঁধ স্থাপন করা হয়েছে। বলা হচ্ছে বিহারের ভেতরের পঁয়ত্রিশ ফুট রাস্তাও বেরিবাঁধের বলে দাবি করা হচ্ছে। এখন আবার আমাদের যে জাদী আছে, সেই জাদীর জায়গাটি প্রেস ক্লাবকে দেয়া হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এভাবে দিন দিন আমাদেরকে হুমকি’র মধ্যে রাখা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমাদেরকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পটুয়াখালী সরকারী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক হোসেন বিল্লা বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সংখ্যালগুদেরকে নিরাপত্তা দেযা। তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। তার পাশাপাশি যারা আমরা সংখ্যাগুরু আছি, তাদের আরো বেশি দায়িত্ব এই সংখ্যালঘুদেরকে রক্ষা করা। আমরা মনে করি আমাদের সকল নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে এই বঞ্চিত ও অনগ্রসর মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আগামী দিনের যে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলা হচ্ছে সেখানেও তাঁদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এইসব মানুষদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা জরুরী বলেও মনে করেন তিনি।

পটুয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সাথী’র সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, রাখাইন সম্প্রদায় বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু তাদেরকে নানাভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আমার সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, রাখাইনদের জমি দখলের জন্য জাল দলিল বানানো হচ্ছে। তাদের উপর মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে হয়রানি করা হ্েচ্ছ। মামলার জটিলতায় পড়ে তারা উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছেন। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মংচোথিন তালুকদার বলেন, এখানে যে আমরা বসবাস করছি, তার অবদান আমাদের পূর্বপুরুষরা। তারাই আমাদের এই কুয়াকাটা অঞ্চলের বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে, আবাদ করে বসবাস যোগ্য করেছেন। এই আঞ্চলের রাখাইন আদিবাসীদের যে বঞ্চনার মধ্যে রাখা হয়েছে তা থেকে মুক্তির জন্য স্থানীয় নাগরিক সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, একটি দেশের শাসন পদ্ধতি কেমন তা সেদেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। আমাদের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও আমাদের বহুসংস্কৃতির দেশ বলে সংবিধানে বলা আছে, সেই বিষয়টি লঙ্ঘন হচ্ছে। রাষ্ট্রধর্ম ধারার পর এক লাইন লেখা আছে যে, এই ধর্মাবলম্বীদের মানুষ ছাড়াও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মানুষরা সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এর মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রের দ্বিতীয় নাগরিক করা হয়েছে। এছাড়া সংখ্যালঘুদের উন্নয়নে আইন পাস হতে দেরি হয়। কিন্তু অন্যান্য নিপীড়নমূলক আইন প্রণয়নে সময় কম লাগে। এদেশের আদীবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

এছাড়াও মতবিনিময় সভায় অংশ নেন টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরাম, পটুয়াখালীর সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম প্রিন্স, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মংচোথিন তালুকদার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত মাহমুদ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোহসিনা হোসাইন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শরীফা উম্মে শিরিনা, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মো: ইলিয়াস হোসেন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান মুন্না, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আফজাল হোসেন প্রমুখ।

Back to top button