জাতীয়

আদিবাসী ফোরামের ৫ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত: সন্তু লারমা ও সঞ্জীব দ্রং’ই থাকলেন নেতৃত্বে

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): গতকাল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশে বসবাসরত ৫৪ টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর একমাত্র সম্মিলিত প্লাটফরম বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর ৫ম জাতীয় সম্মেলন ও কাউন্সিল। এ উপলক্ষ্যে গত ২৮ এপ্রিল শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তন সংগঠনটির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার সভাপতিত্বে দিনব্যাপী পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন আসাদ গেইট এ অবস্থিত সিবিসিবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় দিনব্যাপী কাউন্সিল। চারটি অধিবেশনে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে সারা দেশের আটটি সাংগঠনিক বিভাগ থেকে সংগঠনটির দুই শতাধিক প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক অংশ নেন এবং আদিবাসীদের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে আদিবাসীদের উপর সামগ্রিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, সাফল্য, ব্যর্থতা ও অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে একুশ বছর অতিক্রম করে বাইশ বছরে পদার্পন করল আদিবাসী ফোরাম। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কোনোটাই আদিবাসী জীবনের অনুকূলে নয়। আদিবাসীদের অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখিন ও অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান। যদি দেশে এই ধারা চলতে থাকে তবে আদিবাসীদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন তো দূরের কথা, সংকট আরও ঘনীভূত হলে অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তিনি তাঁর প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন জোরদারকরণ এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশনসহ পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি বাস্তবায়নে অধিকতর উদ্যোগ গ্রহনসহ ১২ টি কর্মসূচিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আগামী দিনে কাজ করবে বলে উপস্থাপন করেন।

কাউন্সিল সূত্রে আরো জানা যায়, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো ও গঠনতন্ত্রেও। মূলত ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির সংখ্যা বাড়িয়ে এবার করা হয়েছে ৩১ জনে। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদটিকে ভেঙ্গে ভাষা ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং ক্রিড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক নামে দু’টি পৃথক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়াও নতুনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে দপ্তর সম্পোদকের পদ এবং বন ও পরিবেশের সাথে আদিবাসীদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে এই কাউন্সিলে বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

কাউন্সিল সূত্র আইপিনিউজকে জানায়, ৫ম জাতীয় কাউন্সিলের সর্বশেষ অধিবেশনে কাউন্সিলে অংশ নেয়া প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে ৭৯ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট কার্যকরী কমিটিও গঠন করা হয়। উক্ত কার্যকরী কমিটিতে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা ও সঞ্জীব দ্রংকে টানা পঞ্চমবারের মতো এবারও নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। মূল আট সাংগঠনিক অঞ্চলের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সভাপতি ও সমতল এলাকার মধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়েছে।

জাতীয় কমিটির নবনির্বাচিতদের মধ্যে সহ সভাপতি অজয় এ মৃ, রবীন্দ্রনাথ সরেন, সহসাধারণ সম্পাদক ডাক্তার গজেন্দ্র নাথ মাহাতো, শরৎ জ্যোতি চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক এন্ড্রু জুয়েল সলোমার, অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক হিরণ মিত্র চাকমা, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বিনোতাময় ধামাই, সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক চন্দ্রা ত্রিপুরা, নারী বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে ফাল্গুনী ত্রিপুরা,সহ-নারী বিষয়ক সম্পাদক সুজয়া ঘাগড়া, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কৃষ্ণপদ মুন্ডা, ক্রিড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক উজ্জ্বল আজিম, ভূমি ও আইন বিষয়ক সম্পাদক পীযুয বর্মণ, দপ্তর সম্পাদক নিটোল চাকমা, ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে হরেন্দ্র নাথ সিংকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশের আট সাংগঠনিক অঞ্চল থেকে যাদেরকে সদস্য নির্বাচিত করা হয়েছে তাঁরা হলেন- দীপায়ন খীসা,পল্লব চাকমা, চঞ্চনা চাকমা, রিপন চন্দ্র বানাই, সোহেল চন্দ্র হাজং।

কাউন্সিলের শেষ অধিবেশনে নবনির্বাচিত সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা নবনির্বাচিত কমিটির সদস্য ও উপস্থিত আদিবাসী নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, সাধারণ চোখে দেখলে মনে হয় পার্বত্য অঞ্চল সুখে বা উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। কিস্তু বাস্তবে তা নয়। সমতলেও আমাদের আদিবাসীদের জীবন খুব বেশি ভালো নেই। আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করে সংগ্রামে লিপ্ত হতে হবে। আদিবাসী ফোরামকে সাংস্কৃতিক কিংবা সামাজিক সংগঠন হিসেবে না দেখে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার মনে করে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দেখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সুবিধাবাদিতা, আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস থেকে বেরিয়ে এসে আমাদেরকে আগামীর লড়াইয়ে ভূমিকা রাখতে হবে। আদিবাসীদের জাতীয় চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে রাজনৈতিকভাবে আরো সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সন্তু লারমা আরো বলেন, আমাদের রাজনৈতিক মান বাড়াতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক পড়াশুনা ও সমাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। আমাদের শিক্ষা তখনি সম্পূর্ণ হবে যখন আমরা আমাদের সমাজকে অনুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবো। মানুষের শিক্ষা তখনি সম্পূর্ণ হয় যখন সে তার সমাজ সম্পর্কে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ পারে। সমাজের কোন স্তরে সে বসবাস করছে এবং কোথায়, কীভাবে সে শাসিত ও শোষিত হচ্ছে তা যদি জানতে না পারে তবে সে আগামীর করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে না। তাই আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে নিজস্ব সমাজ বাস্তবতা সর্ম্পকে সঠিক ধারণা নিয়েই আগামী দিনের লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়তে হবে।

Back to top button