বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়িতে পিসিপির ৯ম সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

আইপিনিউজ বিডি, ২০ অক্টোবর ২০২৬, বান্দরবান প্রতিনিধিঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্রসমাজকে আরও সক্রিয়ভাবে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) ৯ম সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে পিসিপির নাইক্ষ্যংছড়ি থানা শাখার উদ্যোগে এ সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হউন।”
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ২৭৬ নম্বর তরগু মৌজার হেডম্যান ও সাবেক ছাত্রনেতা মংনু মারমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো চাকমা এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নাইক্ষ্যংছড়ি থানা কমিটির সভাপতি প্রুমে মারমা।
অংসাই মারমার সভাপতিত্বে এবং থোইয়লে মারমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন উখিংওয়ং চাক। অনুষ্ঠানের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মাহুতিদানকারী ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মংনু মারমা বলেন, শোষণ, বৈষম্য ও বঞ্চনামুক্ত জুম্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সামষ্টিক উদ্যোগ, সুস্পষ্ট রাজনৈতিক চেতনা এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস প্রয়োজন। এ ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে জুম্ম জাতীয়তাবাদ। জাতিগত বিভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে অভিন্ন জাতিগত স্বার্থ, অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুম্ম সমাজে জাতিগত বিভাজন, গোত্রীয় সংকীর্ণতা ও পারস্পরিক ভেদাভেদকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত উন্নতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তরুণদের সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ও অধিকার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তরুণেরা সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হবে এবং নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করবে। জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছাত্রসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো চাকমা বলেন, আমেরিকার আদিবাসীদের ইতিহাস থেকে জুম্ম জনগণকে শিক্ষা নিতে হবে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ, অবিশ্বাস ও ঐক্যের অভাব তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধকে দুর্বল করেছিল, যার সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা তাদের ভূমি দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ভূমি, সংস্কৃতি, স্বতন্ত্র পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ১৪টি জুম্ম জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ বৈচিত্র্যকে বিভেদের কারণ না করে পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি সম্মান রেখে অভিন্ন জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জুম্ম জাতীয়তাবাদ এ ঐক্যের রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে ছাত্রসমাজকে সচেতন, সংগঠিত ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথি প্রুমে মারমা বলেন, জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী ও সর্বজনীন করতে জুম্ম নারীদের আরও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। সমাজ, পরিবার, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষায় জুম্ম নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিকাশ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। এ সীমাবদ্ধতা দূর করতে নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সাংগঠনিক দক্ষতা বিকাশ এবং নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে অংসাই মারমাকে সভাপতি, থোয়ইলেয় মারমাকে সাধারণ সম্পাদক এবং উখিংওয়ং চাককে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে পিসিপির নাইক্ষ্যংছড়ি থানা শাখার নবম কমিটি গঠন করা হয়। নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথবাক্য পাঠ করান পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক উশৈহ্লা মারমা।
অংসাই মারমার সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলন ও কাউন্সিলের কার্যক্রম শেষ হয়।


