দেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ভূমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজিতে ৩৮ নাগরিকের গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ

আইপিনিউজ বিডি, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ঢাকাঃ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশীশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়িঘর দখল, চরের খাসজমি দখল, হামলা-ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে নাগরিকরা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রকাশ্য দিবালোকে এবং রাতের অন্ধকারে ভূমি দখল, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১ এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, স্থাপনা ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল। এর রেশ না কাটতেই এবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কয়েকশ’ লোক নিয়ে হামলা-ভাঙচুর করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সাতমসজিদ হাউজিং সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে ওই জমিতে থাকা স্থাপনা ও হাউজিংয়ের অফিসে ভাঙচুর করে নগদ ১৫ লাখ টাকা, জমির দলিল, এসি, ফ্যান, জানালা-দরজা, আসবাবপত্রসহ মালামাল লুট করা হয়। এছাড়া রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সালমানের অভিযোগ ‘সরকার দলীয়’ চাঁদাবাজদের চাঁদার টাকা না দেয়ায় তার স্টুডিও ভাংচুর করা হয়। এছাড়াও পটুয়াখালির চরবাংলা, নোয়াখালির সদর উপজেলার ভাটিরটেক ও চরফ্যাশন, ভোলার চরসহ আরো নানা স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসীরা চরে বসবাসরত ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে জমি দখলের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। জমিতে থাকা ফসলও তারা রাতের অন্ধকারে লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়া ছিনতাই- এর ঘটনা ঢাকা মহানগরসহ সকল বড়-ছোট শহরে আশংকাজনক হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে শিশু ধর্ষণ ও নারী বিরোধী সহিংসতা। পুলিশের পক্ষ থেকে কোন কোন এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে সাবধানে চলাচল করার কথা বলা হয়েছে। এ সবই আইন শৃংখলা পরিস্থিতির আশংকাজনক অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, এসব ঘটনার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি, সশস্ত্র অনুসারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান তারা।
নাগরিকরা বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে অনেক ঘটনায় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব বা ভাড়া করা লোকজন ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা বললে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না; এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তাদের রাজনৈতিক বা অন্যান্য প্রভাব কী এবং প্রশাসনের কোনো পর্যায়ে গাফিলতি রয়েছে কি না—তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আসার ক্ষেত্রে বাধা না হয়। ভূমি দখল, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিবৃতিতে তারা এসব ঘটনার দ্রুত উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। একই সঙ্গে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
নাগরিকরা বলেন, এসব ঘটনার দায় শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সরকারের জবাবদিহি রয়েছে।
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন-
১. আনু মোহাম্মদ, প্রাক্তন অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন ৩. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি ৪. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ ৫. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি ৬. আবু সাঈদ খান, লেখক ও সাংবাদিক ৭. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ৮. ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী ও অনারারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্টৃ ৯. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ১০. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী ১১. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি ১২. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৩. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪. ড. গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৬. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এবং পলিটিকাল সাইন্স ১৭. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৮. ড. নোভা আহমেদ, অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯. ড. ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় ২০. রেহনুমা আহমেদ, লেখক ২১. সাঈদ ফেরদৌস, নৃবিজ্ঞানী ও লেখক ২২. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ২৩. ডা. নায়লা খান, অধ্যাপক, নিউরোলজিস্ট ২৪. মো: নুর খান, মানবাধিকারকর্মী ২৫. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক ২৬. ড. ঈশিতা দস্তিদার, নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক ২৭. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ২৮. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকার কর্মী ২৯. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ ৩০. এড. সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন ৩১. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ৩২. রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট ৩৩. শাহেদ কায়েস, কবি ও প্রাবন্ধিক ৩৪. মিঠুন রাকসাম, কবি, প্রকাশক ও আদিবাসী সংস্কৃতি কর্মী ৩৫. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী ৩৬. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী ৩৭. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকার কর্মী ৩৮. মুক্তাশ্রী চাকমা, অধিকার কর্মী


